আমরা

‘বিজ্ঞানপ্রিয়’ বাংলাদেশের একটি অনন্য বিজ্ঞান কনটেন্ট-ভিত্তিক প্লাটফর্ম। ২০১৮ সালে ফেসবুক গ্রুপের হাত ধরে বিজ্ঞানপ্রিয়র যাত্রা শুরু। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চমৎকার সব প্রামাণিক ইনফোগ্রাফিক তথ্য, ভিডিওচিত্র এবং ম্যাগাজিনসহ সময়োপযোগী নানা স্থায়ী-অস্থায়ী উদ্যোগ বিজ্ঞানপ্রিয়কে পৌঁছে দিয়েছে প্রায় ৭ লক্ষাধিক বিজ্ঞানপ্রেমীর মস্তিষ্কে।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ-র আদ্যোপান্ত

বিজ্ঞানপ্রিয় ডেস্ক
JWST

মানবসভ্যতার অনন্তকালের এই যাত্রায় যুগান্তকারী সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে সর্বকালের সেরা আধুনিক জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে। আমরা অনেকেই ইতোমধ্যে টেলিস্কোপের তোলা প্রথম ছবিটি দেখেছি। এই পোস্টে মহাকাশপ্রেমিদের জন্য বিস্তারিত কিছু রইল।

Webb wallpaper.0
হাবল টেলিস্কোপের উত্তরসূরী জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ

১। ওয়েব টেলিস্কোপ পরিচিতি

জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র (ইংরেজি: James Webb Space Telescope বা JWST , সংক্ষেপে ওয়েব (Webb)) মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা, কানাডীয় মহাকাশ সংস্থা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টায় নির্মিত একটি মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র। এটিকে নাসার ধ্বজাধারী নভোপদার্থবৈজ্ঞানিক অভিযান হিসেবে হাবল মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটির উত্তরসূরী হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে এবং ৩০ বছর সময় নিয়ে বানানো ৯৪ হাজার ১৯৫ কোটি ৩৯ লক্ষ্ টাকার এই টেলিস্কোপ অনেক পরীক্ষার পর ২০২১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়। এর ওজন ৬১৬১ কেজি ও আয়ুষ্কাল ২০ বছর।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন, মহাশূন্যে ফুঁড়ে ব্রহ্মাণ্ড তৈরির রহস্য বের করে আনবে নাসার দূরবিন জেমস ওয়েব৷ হাবল টেলিস্কোপের থেকেও এর দূরদৃষ্টি বেশি। এটির দ্বারা ধারণকৃত অবলোহিত বিকিরণ চিত্রণের মাধ্যমে আজ থেকে ১৩৫০ কোটি বছরেরও আগে (মহাবিস্ফোরণের প্রায় ১০ থেকে ২০ কোটি বছর পরে) মহাবিশ্বের প্রথম ছায়াপথ ও আদ্যনক্ষত্রগুলি কীভাবে রূপলাভ করেছিল, তা জানা যাবে। এছাড়া মানুষের বসবাসযোগ্য সম্ভাব্য বহির্গ্রহগুলির আবহমণ্ডলের বিস্তারিত খুঁটিনাটি চরিত্রায়নও সম্ভব হবে। উপরন্তু, এটি সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ, উপগ্রহ ও খ-বস্তুগুলির অনেক বেশি খুঁটিনাটি দেখতে সক্ষম হবে। গর্বের বিষয় হলো, এটি তৈরিতে অবদান আছে এক বাংলাদেশি নারীর।

২। ওয়েব টেলিস্কোপ-এর কার্যপদ্ধতি

Workway
টেলিস্কোপের তথ্য গ্রহণকেন্দ্র

ওয়েবের দূরবীক্ষণ যন্ত্র উপাদানটি তিনটি দর্পণের সমবায়ে গঠিত। প্রথম দর্পণটি ১৮টি ষড়ভুজাকৃতি দর্পণখণ্ডের সমবায়ে নির্মিত। প্রতিটি দর্পণখণ্ডের ব্যাস ১.৩ মিটার এবং এগুলি অত্যন্ত পাতলা (মাত্র ১০০ ন্যানোমিটার পুরু) সোনার প্রলেপ লাগানো বেরিলিয়াম ধাতু দিয়ে তৈরি। সোনা অবলোহিত বিকিরণের জন্য একটি অতি-উৎকৃষ্ট প্রতিফলক এবং রাসায়নিক তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয়। অন্যদিকে বেরিলিয়াম হালকা কিন্তু শক্ত ও অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রাতেও সংকুচিত না হয়ে আকৃতি ধরে রাখতে পারে। দর্পণখণ্ডগুলি একত্রে মিলে একটি বৃহৎ ৬.৫ মিটার ব্যাসবিশিষ্ট মৌচাকের মতো দেখতে প্রায় ষড়ভুজাকৃতি একটি প্রাথমিক দর্পণ গঠন করে, যার ক্ষেত্রফল হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্রের ২.৪ মিটার ব্যাসবিশিষ্ট দর্পণটির ক্ষেত্রফলের তুলনায় ৬ গুণেরও বেশি বড়ো। প্রাথমিক বৃহত্তর অবতল দর্পণটি আলোকরশ্মিগুলি প্রতিফলিত করে অপেক্ষাকৃত ছোটো (০.৭৪ মিটার ব্যাসবিশিষ্ট) ও সামান্য বিষমকেন্দ্রিক একটি দ্বিতীয় উত্তল দর্পণে ফেলে, যেখানে সেগুলি প্রতিফলিত হয়ে একটি তৃতীয় বিষমকেন্দ্রিকতা-দূরকারী দর্পণের উপর পড়ে আলোক-সংবেদী উপকরণের ভেতরে প্রবেশ করে। অত্যধিক প্রাচীন ও অত্যধিক দূরে অবস্থিত আদ্যনক্ষত্র ও আদি ছায়াপথগুলি থেকে আগত রশ্মিগুলি দৃশ্যমান আলো নয়, বরং অদৃশ্য অবলোহিত রশ্মির (এক ধরনের তাপরশ্মি) আকারে আমাদের কাছে পৌঁছায়। অবলোহিত তরঙ্গগুলি গ্যাস ও ধূলিমেঘের ভেতর দিয়ে সহজেই অতিক্রম করে, যেগুলি ভূপৃষ্ঠস্থিত দূরবীক্ষণ যন্ত্র কিংবা হাবল দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এ পর্যন্ত স্পষ্ট করে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু অবলোহিত দূরবীক্ষণ যন্ত্র বিধায় ওয়েব এইসব উচ্চ লোহিত সরণবিশিষ্ট বস্তুসমূহ অতি উচ্চমাত্রার বিভেদনক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা বজায় রেখে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে, যা আগে কখনও সম্ভব হয়নি।

৩। ওয়েবের প্রথম তোলা ছবিটির বর্ণনা

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের অবলোহিত রশ্মি দিয়ে তোলা যে ছবিটা প্রকাশ পেয়েছে তার দূরত্ব পৃথিবী থেকে ৪.৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে উত্তর গোলার্ধের বরাবর। ছবিটি মহাবিশ্বের এযাবৎকালের পাওয়া গভীরতম দৃশ্য। এই ছবিতে আমরা গ্যালাক্সিগুলোর যে অবস্থান দেখছি তা ছায়াপথগুচ্ছ থেকে আলো এসে আমাদের কাছে পৌঁছাতে ৪৬০ কোটি বছর লেগেছে। এর মাঝে কিছু অংশ ১৩০০ কোটি বছরের কাছাকাছি সময়কার। এত দূরের বস্তু ঝাপসা বা দেখার অযোগ্য থাকার কথা, কিন্তু এখানেই জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের বিশেষত্ব, যা এতে অবস্থিত উন্নতমানের Near Infrared এবং Mid Infrared লেন্স দিয়ে তোলার কারণে অদেখাকে দেখা সম্ভব হয়েছে। জেমস ওয়েবের ছবিতে দেখা যাওয়া ছায়াপথগুচ্ছের মোট ভর এত বেশি যে, সেটি মহাকর্ষিক লেন্স হিসেবে কাজ করছে। আর সেই লেন্স দিয়ে পেছনের আরও দূরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু বড়ো হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। সেসব আলোকবিন্দুও একেকটি অদেখা ছায়াপথ, সেখানেও রয়েছে অগণিত গ্রহ-উপগ্রহ।

First Image JWST
প্রথম এই ছবিটি পাঠায় এই টেলিস্কোপটি

ছবিটি আসলে একটি ‘ডিপ ফিল্ড ইমেজ’। ‘ডিপ ফিল্ড ইমেজ’ হলো—যখন মহাবিশ্বের কোনো অংশের ছবি দীর্ঘ সময় নিয়ে তোলা হয়। জেমস ওয়েবের তোলা ছবিটির ক্ষেত্রে সে সময়টি ছিল সাড়ে বারো ঘণ্টা। জেমস ওয়েবের তোলা ছবিটি মহাবিশ্বের বিশালত্বের তুলনায় ধূলিকণার সমান। ছবিতে বেশি উজ্জ্বল ও লম্বাটে যেসব দাগ দেখা যাচ্ছে—সেগুলো পৃথিবীর আবাসস্থল আকাশগঙ্গা ছায়াপথ বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির প্রতিবেশী তারকা। এ ছাড়া অন্য আলোকবিন্দুগুলো একেকটি ছায়াপথ, তারকা নয়। ১৫৬টি ভিন্ন স্থান থেকে এবং এনআইআর ক্যামেরা সেন্সর ব্যবহার করে তৈরি করা ১৫৬০টি ছবির প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমেই ভিজ্যুয়ালটি সামনে এসেছে। র’ (Raw) ছবিতে এত বর্ণ থাকে না। পরবর্তীতে ফিল্টার ব্যবহার করে গ্যাসের ধরণ অনুযায়ী বর্ণময় করা হয়। নিচের শেষের ছবি দুটিতে কয়েকটি ১৩ বিলিয়ন বছর; গ্যালাক্সিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে ও গ্যাসের ধরণ অনুযায়ী রঙ বুঝানো হয়েছে।

প্রথম ছবি রিলিজে এত সময় লাগার কারণ: টেলিস্কোপটিঃকে অনেক যত্নের সাথে ভাঁজ থেকে খোলা হয় ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে নিয়ে। টেলিস্কোপে ৩৪৪ টি জায়গায় অকার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা ছিল যা ঘটলে সম্পূর্ণ পরিশ্রম বিফলে যেতো। এর ক্যামেরাকে -282.78 ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেওয়া হয় স্পষ্ট অবলহিত আলো প্রেরণের জন্য।

৪। হাবল টেলিস্কোপ বনাম ওয়েব টেলিস্কোপ

Habble JWST
দিনে দিনে আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে টেলিস্কোপ

নাসার আগের হাবল টেলিস্কোপ যেসব জ্যোতিষ্ক দেখতে পেত না, সেগুলোও অনায়াসে দেখতে পাচ্ছে জেমস ওয়েবের ক্যামেরা। হাবল টেলিস্কোপ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ একধাপ এগিয়ে পৃথিবী থেকে ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পৃথিবীর সাথে সূর্যকে বছরে ১ বার প্রদক্ষিণ করছে। বিজ্ঞানীরা এতদিন অস্পষ্ট ছবি থেকে গাণিতিক অ্যালগরিদম দিয়ে জটিল জটিল রহস্য বের করে আসছেন। আর এখন তো সেই ছবি আরও বেশি স্পষ্ট ও নিখুঁত যা একে ৩২ বছর ধরে চলে আসা হাবল টেলিস্কোপের যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবেই মানায়। যেখানে হাবলকে নিকট-অতিবেগুনি, দৃশ্যমান আলো ও নিকট-অবলোহিত বিকিরণ (০.১ থেকে ১ মাইক্রোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যবিশিষ্ট) বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, তার বিপরীতে ওয়েব অপেক্ষাকৃত নিম্নতর কম্পাঙ্কের পরিসীমার বিকিরণ পর্যবেক্ষণ করবে, যার মধ্যে দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দৃশ্যমান কমলা আলো থেকে শুরু করে মধ্য-অবলোহিত তরঙ্গগুলি অন্তর্ভুক্ত (০.৬-২৮.৩ মাইক্রোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যবিশিষ্ট)। ফলে এটি একই সাথে হাবল মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র ও স্পিটজার মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের (একটি ০.৮৫ মিটার ব্যাসের অবলোহিত দূরবীক্ষণ যন্ত্র) ভবিষ্যত উত্তরসূরী। যদিও দুটোই এখন একসাথে চলবে তবে হাবল টেলিস্কোপের আয়ু প্রায় শেষের দিকে।

৫। হাবল টেলিস্কোপ বনাম ওয়েব টেলিস্কোপ-র ছবিতে সৃষ্ট উল্লেখযোগ্য বিচ্ছুরণ স্পাইক

নিচের ছবি দুটি জুম করলে দেখা যাবে হাবল টেলিস্কোপ-এর তোলা উজ্জ্বল আলোক বিন্দুতে ৪টি করে স্পাইক কিন্তু ওয়েব টেলিস্কোপ-এর ছবিতে ৮টি করে স্পাইক।

293435449 2328106170677460 769682208085648083 n
জেমস ওয়েবের গ্যালাক্সি কম্পোজিশন

হাবল টেলিস্কোপ আয়নার সামনে লম্বালম্বি ৪টি স্ট্রুটস (প্রাথমিক আয়নার উপর যেসব দণ্ডের উপর ভিক্তি করে সেকেন্ডারি আয়না বসানো থাকে) ব্যবহার করায় আলোর বিচ্ছুরণ স্পাইক ৪টি অন্যদিকে ওয়েব টেলিস্কোপ প্রাথমিক আয়নার সামনে ৩টি স্ট্রুটস ব্যাবহার করায় আলোর বিচ্ছুরন স্পাইক ৬ ভাগে বিভক্ত ( উপর-নিচ-কোনাকুনি)। স্ট্রুটস না থাকলেও আয়নার আকারের উপর ভিক্তি করে আলো বিচ্ছুরিত হতো। তখন হাবলের গোলাকার আয়নায় গোলাকার আলকবিন্দু কিন্তু ওয়েবের ষড়ভুজ আকার আয়নায় ৬টা স্পাইক দেখা যায় (কোণাকুণি-ডানে-বামে) । এভাবে স্ট্রুটস ও আয়না মিলে মোট ৮টা দৃশ্যমান স্পাইকের সৃষ্টি করে।

৬। রেডশিফট লাইট

293507965 2328104554010955 5488628575820466901 n

১৩ বিলিয়ন বছর এত লম্বা সময় ধরে আসা আলোর রঙ/ তরঙ্গদৈর্ঘ্য শিফট হয়ে ইনফ্রারেড আলো হিসেবে আসে। এর কারণ জেনারেল রিলেটিভিটি অনুযায়ী, মহাবিশ্ব যে সম্প্রসারিত হচ্ছে তাই আলোও সম্প্রসারিত হয়ে তরঙ্গদৈর্ঘ্য লম্বা হয়ে যায় যা খালি চোখে স্পষ্ট দেখা যায় না। এভাবেই সবচেয়ে দূরের দৃশ্যমান/অতিবেগুনি আলো এতদূর রেডশিফটেড হয়ে আসে Mid Infrared এবং Near- Infrared ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বর্ণালী হিসেবে। যা দেখার জন্য জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে আছে নীচের ক্যামেরাগুলো।

নিন্মোক্ত উন্নতমানের যন্ত্র সমুহ এই টেলিস্কোপে ব্যাবহার করা হয়েছে

  • Near Infrared Camera (NIRCam)
  • Near Infrared Spectrograph (NIRSpec)
  • Mid Infrared Instrument (MIRI)
  • Fine Guidance Sensors/Near Infrared Imager and Slitless Spectrograph (FGS/NIRISS)
  • Lightweight optics
  • Deployable sunshield
  • Folding segmented mirror
  • Improved Detectors
  • Cryogenic actuators & mirror control
  • Micro-shutters

দুই.

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ ও বিগ ব্যাং

বিগ ব্যাং সংগঠিত হয় প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর পূর্বে। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ দিয়ে যেহেতু ১৩১০ কোটি বছর আগের ছবি তুলতে পেরেছে তাহলে আর ৭০ কোটি বছরের বেশি সময়ের ছবি তুলতে পারলে তো বিগ ব্যাং দেখতে পারবো তাই না?

উত্তর হচ্ছে ‘না‘। বিগ ব্যাং আসলে দেখতে পাওয়ার মতো কোনো বিষয়ই না। আমরা যা দেখতে পারবো তা হচ্ছে বিগ ব্যাং-র প্রায় ১০ কোটি থেকে ২৫ কোটি বছর পর প্রথম যে নক্ষত্র, গ্রহ জন্ম হয় সেটি।

প্রথমে আসি বিগ ব্যাং কী?

আমরা দেখতে পাই এই অসীম মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আমরা একটি নির্দিষ্ট টাইম অ্যান্ড স্পেস কল্পনা করি যার মাঝে কেন্দ্র অবস্থিত। এখন এই টাইম অ্যান্ড স্পেস-র ভেতরেই যদি একটি আতশবাজি ফুটানো হয় তাহলে যেই ব্যাপারটা ঘটবে সেটাই মূলত বিগ ব্যাং-র ধারণা। বিগ ব্যাং শুধু সময়ের একটি পয়েন্টে ঘটেনি বরং ঘটেছিল সর্বত্র, একই সময়ে। আমরা এটি জানি কারণ—

১। আমরা ছায়াপথগুলিকে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় বিন্দু থেকে নয় বরং একে অপরের থেকে দূরে ছুটে যেতে দেখি।

২। আমরা দেখতে পাই যে তাপ আদিকাল থেকে অবশিষ্ট ছিল, সেই তাপ সমানভাবে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিগ ব্যাং দেখা না গেলে আমরা তাহলে আর কী দেখতে পারবো?

— তাপ।

১৩৮০ কোটি বছর আগে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ শুরু হওয়ার প্রায় ৩৮ লক্ষ বছর পরে সেখানে যে তাপ ছিল তা আমরা দেখতে পাচ্ছি (যাকে আমরা বিগ ব্যাং হিসাবে উল্লেখ করি)। এই তাপ সমগ্র আকাশ জুড়ে এবং মহাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে (এখনও আছে)। নাসা স্যাটেলাইট দিয়ে এই তাপের ম্যাপ করতে সক্ষম হয়েছে।

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ দিয়ে কতদূর দেখা যাবে?

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপকে মহাবিশ্বের জন্ম দেখতে পাওয়ার মতো করে বানানো হয়নি। এটি দেখতে পারবে মহাবিশ্বের অনেক পুরাতন একটি সময় যা মানুষ এর আগে কখনো দেখেনি (সর্বোচ্চ বিগ ব্যাং সংগঠিত হওয়ার ১০ কোটি থেকে ২৫ কোটি বছরের মধ্যকার সময়)। হাবল টেলিস্কোপ যথেষ্ট বড়ো ও ঠাণ্ডা না হওয়ায় ক্ষুদ্র তাপ সংকেত ধরতে পারতো না।

বিগ ব্যাং-এর মাত্র ৩ লক্ষ ৮০ হাজার বছর পরের তাপের অস্তিত্ব দেখে বলা হয় সে সময় ও কোনো তারা/গ্রহ ছিল না। ছিল শুধু অন্ধকার।

বিগ ব্যাং-এর পর অনেকটা সময় মহাবিশ্ব অন্ধকারে ছিল কারন, তখন মহাবিশ্বের অবস্থা পরমাণুর তৈরি গরম সুপের মতো ছিল। মহাবিশ্ব ঠাণ্ডা হওয়ার পর যখন আয়নিত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম মিলে প্রথম পরমাণুর গঠন করে তখন শুরু হয় আলোর পথ চলা । বিগ ব্যাং সংগঠনের প্রায় ১০ কোটি থেকে ২৫ কোটি বছর পর (সঠিক সময়টি আসলে বিজ্ঞানীদের অজানা) অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে প্রথম আলোর উৎস তৈরি হয়। সেই আলোোকেই আমরা দেখার চেষ্টা করছি ।

নাসার তৈরি Cosmic Background Explorer (১৯৮৯), Wilkinson Microwave Anisotropy Probe (২০০১) ও Europian Space Agency-এর তৈরি Planck (১৯৯৫) এই ৩টি স্যাটেলাইট দিয়ে অলরেডি জেমস ওয়েব-এর চাইতেও দূরের তথ্য সংগ্রহ করেছে। এদের কাজ ছিল মহাবিশ্বের শুরুর সময়ের ইনফ্রারেড, মাইক্রোওয়েভ রশ্মি পরিমাপ করা, কসমোলজির মৌলিক হিসাব বের করে মডেল তৈরি করা, ডার্ক ম্যাটার ও ম্যাটার পরিমাপ, প্রারম্ভিক মহাবিশ্ব-র জন্মের কসমিক স্ট্রাকচার তাপমাত্রা, রেডিয়েশন ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করা। যার ফলস্বরূপ আমরা মহাবিশ্ব নিয়ে এত তথ্য জানতে পারি।

293869286 2329003697254374 1688144323261776880 n
জেমস ওয়েবের পরিধি

নিঃসন্দেহে সামনে অনেক আজানা রহস্য উন্মচিত হবে যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কৃষ্ণবিবরের বা মহাবিশ্বের শেষ প্রান্ত দেখা। এতো মাত্র শুরু।


লেখা: মো. রেদোয়ান আহমেদ,
সম্পাদনা: মো. তৌহিদুজ্জামান।

তথ্যসূত্র

Total
0
Shares
Leave a Reply

Your email address will not be published.