আমরা

‘বিজ্ঞানপ্রিয়’ বাংলাদেশের একটি অনন্য বিজ্ঞান কনটেন্ট-ভিত্তিক প্লাটফর্ম। ২০১৮ সালে ফেসবুক গ্রুপের হাত ধরে বিজ্ঞানপ্রিয়র যাত্রা শুরু। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চমৎকার সব প্রামাণিক ইনফোগ্রাফিক তথ্য, ভিডিওচিত্র এবং ম্যাগাজিনসহ সময়োপযোগী নানা স্থায়ী-অস্থায়ী উদ্যোগ বিজ্ঞানপ্রিয়কে পৌঁছে দিয়েছে প্রায় ৭ লক্ষাধিক বিজ্ঞানপ্রেমীর মস্তিষ্কে।

যন্ত্রের নাড়ির টান

ঋভু দত্ত
যন্ত্রের নাড়ির টান — the very pulse of the machine

এক.

ক্লিক!

শব্দ করেই রেডিয়োটা জীবন্ত হয়ে উঠল।

— “হ্যাল…!

এসত্ত্বেও, মার্থা সামনে চোখ রেখে পা চালানোর দিকেই পুরো মনোযোগটা দিল। বৃহষ্পতি গ্রহ তার এক কাঁধে, দাইদালাস প্লুম আরেক। কিছুই না, শুধু হেঁচড়ানো, টানা, হেঁচড়ানো, টানা… সামান্য বিষয়!

— “অহ।

মার্থা রেডিয়ো বন্ধ করে দিল।

ক্লিক!

— “হ্যাল…অহ কেভ-এল-সন।

— “চুপ করো, চুপ করো, চুপ করো !” রাগের মাথায়, বার্টনের দেহ বহন করা স্লেজের দড়ি ধরে একটা জোর ঝাঁকি দিল মার্থা, সেটা লাফিয়ে উঠলো সালফারের আস্তরণ দেওয়া মাটিতে। “বার্টন, তুমি মৃত এবং আমিই সেটা নিশ্চিত করেছি। তোমার মুখমণ্ডলে এতটাই গভীর একটি গর্ত হয়েছে যে, হাত মুঠো করে সেখানে ঢুকানো যাবে। আর আমি এভাবে ভেঙে পড়তে চাই না। এই দুরূহ অস্বস্তিকর পরিবেশে আমি আর পারছি না! দোহাই লাগে চুপ করো !

— “বার্ট-ন নই।

 — “দয়া করে হও !”

সে আবারও রেডিয়োটা বন্ধ করে দিল। 

বৃহস্পতির পশ্চিম দিগন্তে নেমে এসেছে, বড়ো, উজ্জ্বল আর সুন্দর এবং এই গ্রহের সবচেয়ে বিশাল চাঁদ আইও (IO)-তে দুই সপ্তাহ থাকার ফলে খুব সহজেই উপক্ষেণীয়। ওদিকে বামে, দাইদালাস-এর মুখ থেক উঠে আসছিল সালফার আর সালফার-ডাইঅক্সাইড যা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার উপর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছিল। প্লুমটার উপর ঠাণ্ডা একটা আলোর আভা, আর মার্থার ভাইজরে সেটাকে দেখাচ্ছিল, মলিন নীল রঙের। মহাবিশ্বের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ঘটনা, কিন্ত সে এসব উপভোগের অবস্থায় ছিল না। 

ক্লিক! 

কিছু বলে ওঠার আগেই, মার্থা বলে উঠল, “আমি আর পাগল হতে চাই না, যেখানে তুমি আমার অবচেতন মনের সৃষ্টি, মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার ফল ছাড়া আর কিছুই না। তোমাকে নিয়ে আমি ভাবতে চাইছি না। এবেলা আর একটা কথাও তোমার থেকে শুনতে চাই না !”

the very pulse of the machine
মার্থা ঠিক কার গলা শুনতে পাচ্ছে? যন্ত্র না বার্টন! কিন্তু সে তো নিজেই তো মৃত্যু নিশ্চিত করল।

মুন-রোভারটি পাঁচবার উল্টিয়ে সিডনি অপেরা হাউসের সমান একটা পাথরের চাই-এর সাথে ধাক্কা খেয়ে তবেই থেমেছিল। ভীত দর্শকের মতো মার্থা ক্যাভেলসন-এর অবস্থা এতই করুণ ছিল যে, পুরো বিশ্বের উলটে যাওয়া শেষে সিটবেল্টের শক্ত বাঁধন কাঁটাতে তাকে বেশ বেগ পোহাতে হয়েছিল। অন্যদিকে, লম্বা এবং অ্যাথলেটিক জুলিয়ে বার্টন নিজের ভাগ্য আর সক্ষমতার উপর এত বিশ্বাস রেখেছিল যে, পুরো ব্যাপারটা তাকে যেন স্পর্শই করল না…বরং কোনো অহংকারের বশেই, একপাশে ছিটকে গেল। 

যদিও, সালফার ডাই-অক্সাইড-এর তুষারঝড় বেশ দৃষ্টি আচ্ছন্নকারী, কিন্তু পরিবেশের আবহে ভরকে না গিয়ে তখুনিই মার্থা এই তেজি শুভ্রতার ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়। তার দৃষ্টি স্থির হলো ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধারকৃত স্যুটেট অবয়বে। 

তবে, মূহুর্তেই সে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। 

যে নব বা ফ্ল্যাঞ্জের সাথে বার্টনের হ্যালমেট ধাক্কা খেয়েছিল, সেটি তার মাথার প্রতি মোটেও সহায়ক ছিল না। 

পাথরের চাইয়ের সংস্পর্শে থেকে, সালফার ডাই অক্সাইড-এর তুষার স্তুপ জমে উঠেছিল পাশেই। হঠাৎ করেই, দুই চার না ভেবে দুই হাত ভর্তি করা সেই তুষার দিয়ে বুজে দিল বার্টনের হ্যালমেটের গর্তটা। যদিও এটা বেশ একটা নির্বুদ্ধিতার কাজ ছিল, কারণ এই ভ্যাকুয়াম পরিবেশে, মৃতদেহের কিছু হবে না। অথবা এই কাজটা শুধুই বার্টনের মুখোমণ্ডল ঢেকে দেবার উদ্দেশ্যেই হয়তো !

মার্থা তার হাঁটু এবং হাতের উপর ভর দিয়ে বসে পড়ল। যে তুষারঝড় হঠাত করেই শুরু হয়েছিল, মার্থা বসার সাথে সাথে সেটা চোখের পলকেই থেমে গেল। উঠে দাঁড়ানোর সাথে, মার্থার নিজেকে খুব আশ্চর্যজনকভাবেই নিজেকে বোকা লাগা শুরু হলো। কিন্তু তাই বলে তো আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। শুভস্য শ্রীঘ্রম্‌, নিজেকে প্রবোধ দিলো সে, “তুষার ঝড় হয়তো থামেনি, এটা সামান্য বিরতি হতে পারে মাত্র !”

আবর্জনার স্তুপ থেকে নিজের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আলাদা করতে গিয়ে, বেশ ভীতির সাথে মার্থা লক্ষ্য করল তাদের মুনরোভার-এর মাদার ট্যাংকটা বেশ ক্ষতিগ্রস্থ। এই ট্যাংক থেকেই তারা তাদের অক্সিজেনের প্যাকগুলো রিচার্জ করতো। যদিও দুটি ফুল-চার্জড ব্যাক-আপ প্যাক আছে। বার্টনের নিজের প্যাকটাও এক তৃতীয়াংশ খালি। 

বার্টনের প্যাকটা নিজের স্যুট-এর সাথে জোড়া দেওয়া ব্যাপারটা একমূহুর্তের জন্য বেশ নর-পিশাচ ধরণের চিন্তাভাবনা মনে হলেও, এটা করতেই হবে। “সরি, জুলিয়ে”, প্যাকগুলি তাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যথেষ্ট অক্সিজেন দিয়েছে, মোটামুটি ৪০ ঘণ্টা। মুনরোভারের হাল, এক কয়েল নাইলনের দড়ি, কাজ চালানোর মতো হাতুড়ি ও পাঞ্চ ব্যবহার করে একটা স্লেজও বানিয়ে নিল মার্থা; বার্টনের দেহটা বহন করার জন্য। 

বার্টনকে পিছনে ফেলে আসলে, মার্থা নিজেকে ক্ষমা করতে না পেরেই কুঁড়ে কুঁড়ে মরতো। 

ক্লিক

— “এটা বেশ, ভালো।” 

— “ঠিক বলেছ।” 

মার্থার সামনে পড়ে আছে ধু-ধু সালফার-ডাইঅক্সাইডের প্রান্তর, শক্ত আর শুভ্র সে প্রান্তর। এই প্রান্তর একই সাথে কাচের মতো মসৃণ, আবার ঠাণ্ডা মিছরির ন্যায় ভঙ্গুর। নিজের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা করবার জন্য ভাইজরটা ওপেন করল সে। ল্যান্ডারের কাছে যেতে তাকে অতিক্রম করতে হবে মাত্র ৪৫ মাইল। আর তারপরই, সে মুক্ত, স্বাধীনতার স্বাদ পাবে অনেকদিন পর! 

কোনো চিন্তা নেই, নিজেকে আশ্বস্ত করে নিল। IO এই মুহুর্তে বৃহস্পতি গ্রহের সাথে টাইডাল-লক অবস্থায় আছে। সে হিসেবে, গ্রহশ্রেষ্ঠ বৃহষ্পতিকে দিকনির্দেশন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে সহজেই। শুধু ডান কাঁধে বৃহস্পতি আর অপর কাঁধে দাইদালাস। কাজ এভাবে চালিয়ে নেওয়া যাবে। 

— “সালফার হলো, Triboelectric।” 

— “এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলাটা বন্ধ করো। তুমি আসলে কী চাও?” 

— “And now I see. With eye serene. The very. Pulse. Of the machine.” 

এক প্রহর নীরবতা। 

— “ওর্ডসওর্থ।”

ব্যাপারটা, কিছু সময়ের জন্য, একেবারেই বার্টনের মতো শুনাল। নীরবতার সময়টুকু মার্থাকে নিয়ে গেল বার্টনের শাস্ত্রীয় শিক্ষা-দীক্ষা আর আর সেকেলে কবিদের প্রতি তার ভালোবাসার কাছে, স্পেনসার, গিনসবার্গ আর প্লেথ। বার্টন আসলেই একজন কাব্য-পাগল ছিল, তার উৎসাহটাই ছিল আলাদা। 

আওড়ানো কোটেশনগুলো মার্থাকে শোকে ডুবাল, কিন্তু শোক পালনের জন্য পরে যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে। আপাতত হাতের কাজটা শেষ করাটা জরুরি এবং অত্যাবশক। 

সামনে বিস্তর্ণ প্রান্তরের বর্ণ ছিল, আবছা আর বাদামি। মার্থা চিবুকে সামান্য টোকা দিয়ে, রঙ এর তীব্রতা বাড়িয়ে দিল। পরক্ষণেই তার চোখের সামনে ভরে উঠলো, হলুদ, লাল, কমলা রঙে, খুবই তীব্র মোম রঙে। এটাই বেশি পছন্দ হলো তার কাছে। 

মার্থা এখন নিজের সম্বল নিজেই, এই রুক্ষ আর নির্দয় মহাবিশ্বের নির্জন গ্রহে। 

বার্টন মৃত। IO-তে এখন সে ছাড়া আর কেউ নেই, সত্যিই কোথাও কেউ নেই। নিজের উপর নির্ভর করা ছাড়া তার সামনে আর কিছু নেই। এমনকি, কিছু ভুল করে ফেললেও, দোষ ধরারোও কেউ নেই। দূরের পাহাড়ের মতো, শীতল আর অন্ধকার একটা উচ্ছ্বাস মার্থাকে পেয়ে বসল। লজ্জাজনক হলেও সত্য, সে কতটা খুশি ছিল! 

কিছুক্ষণ পরেই, সে বলল, “গান-টান কিছু জানো নাকি?”

Oh, the bear went over the mountain. The bear went over the mountain. The bear went over the mountain. To see what he could see. 

— “জেগে ওঠো, জেগে ওঠো।”

To see what he could…

— “জেগ ওঠো, জেগে ওঠো জাগো।” 

হুহ? কী?”

— “সালফার ক্রিস্টাল অবস্থায় অর্থোরম্বিক।” 

সে ছিল, মাঠ ভর্তি সালফারের ফুলের ভেতর। যতদূর চোখ যায়, ততদূর পর্যন্ত ক্রিস্টাল সালফার, তার হাতের সমান বড়, অনেকটা পপি ভর্তি ফ্ল্যান্ডার্স মাঠের মতো, অথবা, ওজের জাদুকরের মতো। আর তার পিছনে, ভেঙে যাওয়া ফুল (বা সালফারের ক্রিস্টাল)-এর ট্রেইল, কিছু তার পায়ের চাপে, কিছু বার্টনের স্লেজের আঘাতে আর কিছু মার্থার স্যুট থেকে বের হওয়া তাপের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ। 

আরও পড়ুন: কখন মানুষই মানুষের মাংস খায়!

সোজা পথ থেকে অনেকটা দূরে মার্থা, এতক্ষণ ধরে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে চলার ফল এটা। ঘোরের ভেতর হোঁচট খাওয়া, তারপর দিক পরিবর্তন হতে হতে সে এখন এখানে। 

মার্থার স্মৃতিকাতর, সে আর বার্টন কতই না উচ্ছ্বসিত ছিল, যখন তারা প্রথম এই ক্রিস্টালগুলো আবিষ্কার করেছিল। ভেবেছিলো, এটাই সুযোগ, ইতিহাস বইতে নিজেদের নাম লেখানোর। এমনকি, তারা রেডিয়োতে সেটা জানিয়েছিল। ফিরতি কলে তাদের জানানো হয়েছিল, এখানে জীবন বিকাশের কোনো সম্ভাবনাই নেই, বরং শুধুই সালফারের ক্রিস্টাল ফরমেশন। 

তবুও সামান্য এই তথ্য তাদের আনন্দকে দমাতে অসমর্থ ছিল। বরং এটা ছিল তাদের প্রথম বড়ো কোনো আবিষ্কার, বিশাল প্রাপ্তি। 

তারা আরো বেশি কিছুর জন্য মুখিয়ে ছিল। আর এখন, মার্থার মাথাতে শুধু এটাই ঘুরপাক খাচ্ছে, এধরণের ক্রিস্টাল জন্ম নেয় সালফারের উষ্ণ প্রস্রবণ, ল্যাটেরাল প্লুম আর আগ্নেয় হটস্পটগুলোর চারপাশে। 

তবে এর ভেতরই, দূরদিগন্তে মজার কিছু জিনিস ঘটছিল। এক্সট্রিম ম্যাগনিফিকেশনে নিজের ভাইজর সেট করে সেটা বুঝলো সে। আপনা আপনিই মুছে যাচ্ছে তার তৈরি করা ট্রেইলটা। সেখানে জন্ম নিচ্ছে নতুন সালফারের ফুল, ছোট হলেও নিখুঁত, মনের মতোই। একই সাথে এদের বৃদ্ধিও হচ্ছে। এখানে কি হচ্ছে তা ভেবে পেল না সে। এটা ঠিক কোন ধরণের ইলেক্ট্রোডিপোজিশন? কিংবা কোন সিউডোক্যাপিলারি অ্যাকশনের মাধ্যমে আণবিক সালফার মাটি থেকে উঠে এসে জমা হচ্ছে? নাকি IO-এর একেবারে অস্তিত্বহীন বায়ুমণ্ডল থেকে সালফার কণা সংগ্রহ করে নিচ্ছে ফুলগুলি? 

গতকাল হলে এই প্রশ্নগুলি তার ভেতর উত্তেজনা জাগিয়ে তুলতো। কিন্তু আজ, আজ তার আশ্চর্য হবার মতো শক্তি নেই, কারণ নেই। এমনকি, এমন কোনো যন্ত্রপাতি তার কাছে নেই যে, যেটা দিয়ে সে ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। সব পড়ে রয়েছে সেই মুনরোভারে, আর স্যুটের সামান্য ইলেকট্রনিকসকে বাঁচানোর জন্য, বলতে গেলে কিছুই আনেনি সে। তার সম্বল শুধুই সে নিজে, জীবনটা ধরে রাখার অক্সিজেন প্যাকেট, স্লেজটা আর বার্টনের প্রাণহীন দেহ। 

“ড্যাম, ড্যাম, ড্যাম” বিড়বিড় করলো সে। একদিকে এই জায়গাটি দাঁড়ানোর মতো মোটেও নিরাপদ নয়। আবার অন্যদিকে, সে প্রায় ২০ ঘণ্টার মতো জাগা আর পারলে দাঁড়িয়েই ঘুমিয়ে পড়ে এমন। অবসন্ন, আর ক্লান্ত, ভীষণ ক্লান্ত। 

— “O sleep! It is a gentle thing. Beloved from pole to pole. Coleridge.”

ঈশ্বর জানেন, এটা এই সময়ে কতটা লোভনীয়। কিন্তু সংখ্যাগুলি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিচ্ছে, ঘুমানো যাবে না। কিছুক্ষণ চিবুকে টোকাটুকি করা পর, মার্থা তার স্যুটের সেফটি প্রোগ্রাম ওভাররাইট করে মেডিক্যাল কিটে ঢুকলো। তার আদেশেই, একমূহুর্তে রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়লো মেথামফেটামিন। আর পরমূহুর্তেই, মনে হলো তার মাথা একেবারেই পরিষ্কার আর হৃদপিণ্ড রীতিমতো জ্যাক-হ্যামারের মতো স্পন্দিত হতে লাগলো। 

এটাই বেশ। সে এখন নতুন শক্তিতে পরিপূর্ণ। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সে ভাবলো, সামনে লম্বা পথ, এবার যাওয়া যাক। হাতে এখনো অনেক কাজ। সে দ্রুত সালফারের ফুলেল প্রান্তর ত্যাগ করল। 

বিদায়, ওজ। 

ঘণ্টাখানেক পেরিয়েছে। সে এখন হাঁটছে, ছায়াময় কোনো স্কাল্পচার গার্ডেনে। বিচ্ছিন্ন Lipschitz statue-এর মতো পাইরোক্লাস্টিক সমতলে আগ্নেয়শিলার পিলারগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। সেগুলো প্রায় সবগুলোই ছিল গোল আর গুচ্ছ করে রাখা, অনেকটা দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া ম্যাগমার মতো। 

হঠাৎ মার্থার যখন মনে হলো, বার্টন আর বেঁচে নেই। কিছুক্ষণ নীরবেই সে নিজের ভেতর কাঁদলো। 

কাঁদতে কাঁদতে, সে ভয়ংকরদর্শন পাথরগুলি অতিক্রম করে গেল। গতির কারণে মনে হচ্ছিলো, পাথরগুলি বুঝি নাচছে। তার কাছে, সেগুলি নারীরূপীই মনে হলো। 

এখানে, সালফারের তুষার সামান্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এগুলি তার বুটের সংস্পর্শে আসতেই, উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সাদা কুয়াশাতে পরিণত হয় আর ছড়িয়ে যায়। প্রতি পদক্ষেপেই এই কুয়াশা মিলিয়ে যায়, আবার পরবর্তী পদক্ষেপে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এসব পুরো অভিজ্ঞতাকে আরো ভীতিপ্রদ করছিল। 

ক্লিক

— “Io-তে একটা ধাতব কোর আছে, যা মূলত আয়রন আর আয়রন সালফাইড দিয়ে তৈরি, যার উপর আছে অর্ধগলিত পাথর আর ক্রাস্ট”। 

— “তুমি কি এখনো আছো?” 

— “আমি যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি।” 

— ”চুপ থাকো!” 

মার্থার ধৈর্য হারিয়ে ছটফটাতে লাগল। সে তার গজগুলি পরীক্ষা করে বিড়বিড় করে বলল, “এই নাটক এখানেই শেষ করা দরকার।” 

কিন্তু এর বিপরীতে কোনো উত্তর ভেসে এলো না। 

সন্ধ্যা নামবে, কিন্তু কখন? হিসেব করা যাক, IO-এর বছর, অর্থাৎ যে সময়ে সে বৃহষ্পতিকে একবার সম্পূর্ণ প্রদক্ষিণ করে, সেই সময়টা মোটামুটি ৪২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। সে গত সাত ঘণ্টা ধরে হাঁটছে, যার অর্থ IO তার কক্ষপথের ষাট ডিগ্রি ঘুরে গেছে। সুতরাং, সন্ধ্যা নামবে খুব দ্রুত। এতে করে যে সমস্যাটা হবে, দাইদালাস প্লুমটা ঠিকমত দেখা যাবে না। অবশ্য, হেলম্যাটের গ্রাফিক্সের কাছে এটা কোনো ব্যাপারই না। মার্থা একমূহুর্ত মাথা ঘুরিয়ে দেখলো, গ্রহগুরু বৃহষ্পতি আর দাইদালাস প্লুম এখনও তাদের জায়গায় আছে কি না, আর সেটা নিশ্চিত করা মাত্রই পুনরায় হাঁটা শুরু করল। 

একা হয়ে যাওয়া মার্থার জন্য জেগে আছে কেবল জুপিটারের সবচেয়ে বড়ো চাঁদটা
একা হয়ে যাওয়া মার্থার জন্য জেগে আছে কেবল জুপিটারের সবচেয়ে বড়ো চাঁদটা আর দৈত্যাকার গ্রহটা।

টানো, টানো, টানো। চেষ্টা করো, যাতে পাঁচ মিনিট অন্তর ম্যাপটা ভাইজরে ভাসিয়ে তুলতে না হয়। অন্তত যতক্ষণ পারো, বন্ধ রাখো, মাত্র একটা ঘণ্টা। আর আবার দুই মাইল পরে আবার, খুব একটা বাজে নয়। 

সূর্য আস্তে আস্তে মাথার উপর চড়ছে। হয়তো, এক থেকে দেড় ঘণ্টার ভেতর দুপুর হয়ে যাবে। এটার মানে!  এটার এই মূহুর্তে আসলে কোনো মানে হয় না।

সামনে একটা বড়ো পাথর, হতে পারে সিলিকেট। কোনো অদৃশ্য শক্তি এই ছয় ফুট উঁচু জিনিসটা এখানে নিয়ে এসেছে, আর না জানি কত হাজার বছর ধরে অপেক্ষা করছে কেবল তার জন্য, সে আসবে এবং বিশ্রামের জন্য থামবে। পাথরের গায়ে সে একটা চ্যাপ্টা তল খুজে বের করল, যাতে সে অন্তত হেলান দিতে পারবে। সে বিশ্রাম নেবার জন্য বসে পড়ল। আর শুরু হলো চিন্তা, বারবার অক্সিজেন প্যাকগুলো পরখ করা। তার বর্তমান এয়ারপ্যাকটা আর চারঘণ্টা পর পরিবর্তন করতে হবে, যেটা তার বর্তমান এয়ারপ্যাকের সংখ্যাটা কমিয়ে দুইটিতে নিয়ে আসবে। দুই ঘণ্টায় এক মাইল পাড়ি দেওয়াটা এর দ্বারা সম্ভব হবে না। কারণ, এই মূহুর্তে অক্সিজেন আছে ২৪ ঘণ্টার কিছু কম আর যেতে হবে প্রায় ৩৫ মাইলের মতো। ধারণা করা যায়, যাত্রা শেষের দিকে একটু টানাটানির ভেতর যেতে হবে। আর একটা ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে, “আমি যেন ঘুমিয়ে না পড়ি”। 

ওহ, আর কীভাবে তার গায়ে ব্যাথা করছিল। 

এটা ছিল অনেকটা ‘৮৪ সালে অলিম্পিক গেমস-এর মতো, যখন মার্থা মহিলাদের ম্যারাথনে ব্রোঞ্জ জিতেছিল। কিংবা কেনিয়াতে হওয়া ইন্টারন্যাশনালসে, যখন সে পিছন থেকে দৌঁড়ে আসছিল, দ্বিতীয় স্থানে সমতা করার জন্য। তার জীবনটাই এমন, সবসময় তৃতীয় হয়ে পড়ে থাকা আর দ্বিতীয় হবার জন্য লড়াই করা। সবসময় ফ্লাইট ক্রু, কখনো বা ল্যান্ডিং ক্রু, কিন্তু কোনদিনই কমান্ডার নয়। কোনো দিনই ক্লাস প্রেসিডেন্ট কিংবা কিং অফ দ্য হিলসও নয়। একবার, শুধুমাত্র একবার, সে নীল আর্মস্ট্রং হতে চেয়েছিল। 

ক্লিক 

The marble index of a mind forever. Voyaging through strange seas of thought, alone. Wordsworth.

— “কী?” 

— “বৃহস্পতির ম্যাগনেটোস্ফিয়ার পুরো সৌরজগতের ভেতর সবচেয়ে বিশাল। যদি দেখার সুযোগ থাকতো, তাহলে সেটা আকাশে সূর্য রশ্মির থেকেও দুই থেকে আড়াই গুণ বিস্তৃত লাগতো।”  

— “আমি এটা জানি”, বিরক্তিভরে জবাব দিলো মার্থা।” 

— “প্রশ্ন করা সহজ। বক্তব্য রাখা কঠিন।” 

— “তাহলে কথাই বলো না!” 

— “চেষ্টা করছি, যোগাযোগ করার।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে মার্থা বলল, “আচ্ছা তবে করো যোগাযোগ।” 

তারপর নীরবতা, “এটা কেমন শুনতে?” 

— “কী শুনার কথা বলছ তুমি?” 

IO হলো, বৃহস্পতি গ্রহকে কেন্দ্র করে ঘুরে বেড়ানো সালফার সমৃদ্ধ, আয়রন কোরযুক্ত একটা চাঁদ। এটা শুনতে কেমন? বৃহষ্পতি আর গ্যানিমিড থেকে আসা টাইডাল ফোর্স IO-কে এমন ভাবে আকর্ষণ করে এবং চেপে ধরে আছে, যেটা এর সাব-সারফেস সালফারের সমুদ্র, টারটারাস-কে গলতে সাহায্য করে। টারটারাস-এর অতিরিক্ত শক্তি, সালফার আর সালফার ডাইঅক্সাইডের আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে বের করে দেয়। এটা কেমন, শুনতে? 

IO-এর ধাতব কোর একটা ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করে, যেটা বৃহস্পতির নিজের ম্যাগনেটিক ফিল্ড-র সাথে ধাক্কা খেয়ে একটা ছিদ্র তৈরি করে। এটি একই সাথে, একটি উচ্চ শক্তির আয়ন ফ্লাক্স টিউব তৈরি করে, যেটি নিজের দুই পোলকে যুক্ত করে বৃহষ্পতির নর্থ আর সাউথ পোলের সাথে। কেমন শুনতে, এটা? 

IO মিলিয়ন ভোল্ট পর্যন্ত ইলেকট্রন শুষে নেয়। এর আগ্নেয়গিরিগুলো সালফার ডাই-অক্সাইড নির্গমন করে, আর এর ম্যাগনেটিক ফিল্ড এই নির্গত হওয়া সালফার ডাই-অক্সাইডের অংশ বিশেষ ভেঙ্গে তৈরি করে সালফার আর অক্সিজেন। এই আয়নগুলো পাম্প হয়ে চলে যায়, ম্যাগনেটোস্ফিয়ারে থাকা ছিদ্রের ভেতর। এর ফলে একটা ঘূর্ণায়মান ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয় যাকে বলে, IO torus। এটাই বা শুনতে, কেমন? 

টোরাস, ম্যাগনেটোস্ফিয়ার, আগ্নেয়গিরি, সালফার আয়ন, গলিত সাগর, টাইডাল হিটিং, চক্রাকার ঘূর্ণনপথ… কেমন শুনতে, এসব?” 

একরকম, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই, মার্থা নিজেকে আবিষ্কার করলো প্রথম শুনতে, তারপর চিন্তা করতে আর তারপর, নিজেকে জড়িয়ে নিতে। এটা অনেকটা, রিডল কিংবা শব্দ ধাঁধাঁ-র মতো ছিল। এই প্রশ্নগুলোর সুনিশ্চিত জবাব হয়তো আছে, বার্টন কিংবা হোলস থাকলে তারা সহজেই সেটা ধরে ফেলতো। কিন্তু মার্থাকে চিন্তার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। 

রেডিয়োর কেরিয়ার বিমের অপর পাশে, একটা নম্র গুণগুণ ধ্বনি ভেসে আসছিল, যেনো শব্দটা অনেকক্ষণ ধরেই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে। 

অতঃপর, সে সাবধানে জবাব দিলো, “এটা অনেকটা যন্ত্রে মতো শুনতে” 

হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, যন্ত্র! হ্যাঁ, আমিই যন্ত্র, আমিই যন্ত্র, আমিই সেই মেশিন।” 

— “দাঁড়াও, দাঁড়াও, তারমানে তুমি বলছো যে, IO নিজে একটা যন্ত্র? মানে তুমি একটা যন্ত্র? মানে তুমিই IO?” 

— “সালফার হল ট্রাইবোইলেকট্রিক। স্লেজের ঘর্ষণ-র ফলে তৈরি হয় চার্জ। বার্টনের মস্তিষ্ক এখনো অক্ষত। ভাষা হলো ডাটা বা উপাত্ত। রেডিয়ো হল মাধ্যম। আমি একটি মেশি।” 

— “আমি এখনো তোমাকে বিশ্বাস করি না।

Love Death Robots Season 36 1024x515 3
সে কি তাহাকে ভালোবাসিয়া ফেলেছিল? তাই এই টান!

দুই. যন্ত্রের নাড়ির টান

টানো, হেঁচড়াও, হেঁচড়াও, টানো। মহাবিশ্ব কখনোই অদ্ভুত কিছুর জন্য বসে নেই। শুধুই প্রায় উন্মাদ হয়ে সে ভাবছে যে, IO জীবিত, এবং একটি যন্ত্র, এবং এটি তার সাথে কথাও বলছে; তার মানে এই না যে, মার্থাকে হাঁটা থামিয়ে দিতে হবে। তার এখন, promises to keep, and miles to go before she slept। আর ঘুমের ব্যাপারে যদি বলতে হয়, আরেকটা ফাস্ট রিফ্রেশারের সময় ঘনিয়ে এসেছে, শুধুমাত্র স্পিডের এক-চতুর্থাংশ এবং…

চমৎকার, চলো যাওয়া যাক! 

যতক্ষণ পর্যন্ত সে হাঁটতে থাকে, সে তার হ্যালুসিনেশন বা ডিলুশন বা যা হয় হবে একটা কিছুর সাথে কথাটা চালিয়ে যেতে থাকে। নাহলে, ব্যাপারটা বেশ বিরক্তিকর হয়ে যায়। 

তো সে জিজ্ঞেস করেই বসলো, “তুমি যদি যন্ত্রই হও, তাহলে তোমার কাজটা কী? কীসের জন্য তৈরি তুমি?”

— “তোমাকে জানতে, তোমাকে ভালোবাসতে আর তোমাকে সেবা করতে।” 

মার্থা চোখের পলক ফেলল। আর এর পরেই, বার্টনের ক্যাথলিক বালিকা জীবনের কথা ভেবে হেসে উঠল। মনে পড়ল,  Old Baltimore Catechism-এর প্রথম প্রশ্নটি, “কেন ঈশ্বর মানব-সম্প্রদায়কে সৃষ্টি করলেন?” 

— “আমি যদি তোমার কথা শুনতে থাকি, তাহলে হয়তো অচিরেই মহিমান্বিত কোন বিভ্রান্তিতে পড়ে যাবো।”

— “তুমিই যন্ত্রের সৃষ্টিকর্তা?”  

— “না, আমি নই।” 

কিছু সময় নিস্তব্ধ হয়ে হেঁটে যায় সে। কিন্তু না পেরে মুখ খুললো তখনই, যখন নীরবতা আবার আগের মতো তাকে পেয়ে বসছিল। 

— “কখন আমি তোমাকে তৈরি করলাম?” 

— “So many a million of ages have gone. To the making of man. Alfred, Lord Tennyson.” 

— “তবে, সেটা হয়তো আমি ছিলাম না। আমি মাত্র সাতাশ বছর বয়ষ্ক। তুমি নিশ্চয় অন্য কারো কথা ভাবছ।” 

— “তিনি ছিলেন, চলমান, বুদ্ধিমান, জীবন্ত আর প্রাণবন্ত। তুমিও যে একইরকম, চলমান, বুদ্ধিমান, জীবন্ত আর প্রাণবন্ত” 

হঠাৎ সামান্য দূরে কিছু একটা নড়ে উঠল। মার্থা চোখ তুলে তাকিয়ে বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলো, একটা ঘোড়া। দেখতে মলিন আর ভূতুড়ে ধূসর; যা লেজ আর কেশর উড়িয়ে একেবারে নিঃশব্দে চড়ে বেড়াচ্ছে। 

সে তার চোখ পিটপিট করলো, মাথাও নাড়লো কিছুক্ষণ। চোখ খোলা মাত্রই, ঘোড়াটি শূন্যে মিলিয়ে যায়। এটা একটা হ্যালুসিনেশন বাংলায় বললে দৃষ্টিভ্রম, অনেকটা বার্টন/IO-এর কণ্ঠের মতো। সে চিন্তা করছিল, রিফ্রেশার মাদকের ব্যবহার আবার করবে কি না, কিন্তু বর্তমান ঘটনাবলি তাকে এই কাজ করা থেকে বিরত রাখল। 

ফ্রয়েড বেঁচে থাকলে হয়তো দুই-চারটা মতামত রাখতেন এই ব্যাপারে। তিনি হয়তো বলতেন, সে হয়তো তার বন্ধুকে একজন ঈশ্বররূপে কল্পনা করছে, এটা প্রতিষ্ঠার জন্য যে, সে হয়তো বার্টনের সাথে কোনো প্রতিযোগিতা করে জিততে পারবে না। অথবা বলতেন, মার্থা এটা মেনে নিতে পারছে না যে, কিছু কিছু লোক অন্যান্য কাজে তার থেকেও ভালো। 

হ্যাঁ, তার আত্মসম্মানবোধ ছিল প্রবল। সে ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী, স্বার্থপর। তাতে কী আসে যায়? এটা তাকে এতদূর নিয়ে এসেছে, যেখানে আরো যুক্তিসঙ্গত মনোভাবের কারণে তাকে হয়তো থাকতে হতো Greater Levittown-এর কোনো এক বস্তিতে। কিংবা আট বাই দশ-এর রুমে জীবন কাটাতো একজন ডেন্টাল অ্যাসিস্টেন্ট হয়ে। হতে পারতো প্রতিরাত সস্তা তেলাপিয়া মাছ খেয়ে, রবিবার হয়তো খরগোশের মাংসেই জীবন কেটে যেত। ওটা হতো সাক্ষাত নরক। আর এখানে, এখানে সে জীবিত এবং বার্টন মৃত, যে-কোনো যুক্তিই তাকে এইমূহুর্তে বিজয়ী ঘোষণা করবে। 

— ”তুমি কি শুনছো?” 

— “নাহ, একেবারেই না।” 

পড়তে পারেন: পথে ঘাটে মমি কেন?

একটা চড়াই ধরে হাঁটতে হাঁটতে হুট করেই থামতে হলো। নীচে, অন্ধকারে বিস্তৃত ছিল গলিত সালফার। কমলা রঙের পটভূমিতে এটা বিস্তৃত, কালো আর চওড়া এক সালফারের হ্রদ। হেলমেটের থার্মাল টোপোগ্রাফি খুব দ্রুত কিছু কাজ সেরে নিল, তার পায়ের কাছের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে; ২৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট থেকে লাভার উপরের তাপমাত্রা পাওয়া গেলো ৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট। এরকম পরিবেশে, গলিত সালফার থাকাটা খুব একটা আশ্চর্যজনক নয়। 

লেকটা, তার পথটা আটকে দিয়েছিল। যাকে তারা নাম দিয়েছিল, লেক স্টিক্স। 

মার্থা তার টোপোম্যাপটা নিয়ে আধঘণ্টা বিড়বিড় করে কাটাল, কীভাবে সে এতদূরে বিপথে চলে আসল। এটা তো হবার কথা ছিল না, এখানে সেখানে হোঁচট খাওয়া কিংবা ছোটোখাটো ভুলগুলো তাড়াতাড়ি যোগ করে নিচ্ছে। 

কিন্তু শেষমেশ, যেটা হওয়ার কথা ছিল না, সেটাই হলো। সে এখন, লেক স্টিক্স-এর পাড়ে দাঁড়িয়ে। হতাশা তাকে ঘিরে ধরল। 

লেকটার নাম প্রথম ঠিক করেছিল, যখন তারা গ্যালিলিয়ান সিস্টেমে তাদের প্রথম লুপটা দিচ্ছে। ইঞ্জিনিয়াররা একে বলে, ম্যাপিং রান। তাদের দেখা এটা একমাত্র বড়ো জিনিস ছিল, যা স্যাটেলাইট প্রোব বা  পৃথিবীভিত্তিক রিকোন সিস্টেম তাদের জানাতে ব্যর্থ হয়। হলস মনে করেছিল, এটা কোনো নতুন ঘটনা হতে পারে, যেটা এর বর্তমান আকারে এসেছে গত দশ বছর ধরে। বার্টন মনে ধারণা ছিল, এটা চেক করে দেখতে বেশ মজা হবে। আর মার্থা, এটাকে তেমন পাত্তা দেয়নি, যতক্ষণ না তার মনে হচ্ছিলো সে পিছিয়ে যাচ্ছে। অবশেষে লেকটা তারা তাদের ভ্রমণসূচিতে যুক্ত করেছিল। 

“গাধা, গাধা, গাধা” বিড়বিড় করতে লাগলো মার্থা, অবশ্য নিশ্চিত নয় আসলে কাকে কথাগুলো বলছে হলস, বার্টন না তাকেই। হর্স-শু আকৃতির লেক স্টিক্স ছিল প্রায় ১২ মাইল লম্বা আর সে ছিল একেবারে হর্সশু-এর ভেতরের দিকটাতে। এখন, এয়ারপ্যাকের এই পরিমাণ অক্সিজেন নিয়ে আবার আগের পথ খুঁজে ফিরে যাওয়াটা অসম্ভব। লেকের তরল পদার্থের ঘনত্ব অবশ্য তার সাঁতরে যাবার পক্ষে যথেষ্ঠ ঘন, তবে, সালফারের সান্দ্রতার কারণে, তার স্যুট-র হিট রেডিয়েটরগুলো সালফারে ঢেকে যাবে এবং সম্ভাবনা আছে মাত্র কিছু সময়ের ব্যবধানেই সেটা পুড়ে যাবে। আবার লেকের তরল পদার্থের তরঙ্গ প্রবাহও বা কেমন সেটা অজানা, সুতরাং ডুবে গেলে সেটা হবে ঘন চিনির দ্রবণে ডুবে যাবার মতো, ধীর আর চিটচিটে।

morichika
প্রাণহীন বার্টন কিংবা যন্ত্র নিয়ে ফেরার পথে কত স্মৃতি ভাসে।

সে বসে পড়ল, তারপর কান্না শুরু করল। 

আস্তে আস্তে সে উঠে বসল, আর প্রস্তুতি নিল তার এয়ারপ্যাকটি স্ন্যাপ কাপলিং-র জন্য। এর জন্য একটা সেফটি আছে যদিও। কিন্তু যারা এর যন্ত্রপাতির সাথে পরিচিত, তারা সবাই জানে যে, সেফটিটা বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরে, কাপলিং-র সময় সামান্য ঝাঁকুনি দিয়ে কাজটা করো; পুরো ব্যাপারটা মাঝপথে থেমে, মাত্র এক সেকেন্ড-র ভেতর স্যুটটা খালি হয়ে যাবে। শ্বাস নিতে না পারার অভিনয়টা এতই প্রচলিত, যে-কোনো নবীন মহাকাশচারী তাদের স্যুট-এর কোনো রিডিংয়ে গোলমাল দেখা দিলেই এটা করা শুরু করে। এটার আরেকটা নামও আছে, suicide flick। 

মরার এর চেয়েও খারাপ উপায় আছে। 

— “গড়ে তুলবে… সেতু… যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ আছে… শারীরিক সক্ষমতা একটা সেতু তৈরি করার জন্য।” 

— “হ্যা, তাই তো, ঠিকই, তুমিই সেটা তৈরি করো” মার্থা অন্যমনস্ক হয়ে বলল। তুমি যদি নিজের হ্যালুসিনেশনের প্রতিই যদি নম্র না হও… মার্থা চিন্তাটা আর এগিয়ে নিতে পারল না। ছোটো ছোটো কী জানি তার চামড়া বেয়ে উঠতে শুরু করলো, এগুলাকে পাত্তা না-দেওয়াই ভালো। 

— “এখানে… থামো… সামান্য… বিশ্রাম নাও।” 

সে বসলো ঠিকই, কিন্তু বিশ্রাম নিতে নয়। নিজের সকল সাহস একত্র করে, একই সাথে কিছু চিন্তা করা আর না করার মাঝখানে থেকে হাটুভাঁজ করে সে শুরু করলো, সামন পেছনে দোলা। 

এবং কোনো অর্থ না বুঝেই, ঘুমিয়ে পড়ল। 

— “জেগে… ওঠো… জেগে… ওঠো… জেগে ওঠো।

— “হ্যা?” 

মার্থার নিজেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে বেশ কসরত করতে হলো। লেকের পাড়ে কিছু একটা হয়েছিল। শারীরিক কাযকর্ম চলছিল, আশেপাশের সব নড়াচড়া ঠিক ছিল একই সাথে। 

যখন সে একটু তাকালো, প্রবল বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করল, সাদা ভূ-ত্বক বেরিয়ে আসছে কালো লেকের পাড় থেকে, যেনো সেটা স্নো-ফ্লেক-এর তৈরি আবার তুষার এর মতো ফ্যাকাসে। ততক্ষণ পর্যন্ত গলিত সালফারের লেক জুড়ে বিস্তৃত হল, যতক্ষণ না পর্যন্ত সেটা এপার থেকে ওপারে একটি সরু সেতুর আকৃতি পেল। 

— “তোমার একটু অপেক্ষা করতে হবে”, IO বললো। “বেশি নয়, দশ মিনিট। আর তারপর… তুমি হেঁটে যেতে পারবে… কোনোরকম কষ্ট ছাড়াই।”  

— “কুত্তার বাচ্চা!” সে বিড়বিড় করে বললো, “আমি এখনো সজ্ঞানে আছি।”

অবাক নীরবতায়, কালো লেকের উপর IO-এর তৈরি করা সেতুটা ধরে হাঁটা শুরু করল মার্থা। একবার, কি দুইবার পা সামান্য ডুবে গেলেও, এটা বেশ শক্ত কাজ তার জন্য। এটা ছিল, একটা অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা, অনেকটা মৃত থেকে জীবিত হবার পরিস্থিতি। 

তবে কিছু একটা তখনো তাকে খোঁচাচ্ছিল। এবার সময়, ঝরঝরে হবার। দ্রুত ছয়টা ট্যাপে সে পৌঁছে গেল সেই জায়গাতে, ভেসে উঠল একটা সতর্কবার্তা, Warning: Continued use of this drug at current levels can result in paranoia, psychosis, hallucinations, misperceptions, and hypomania, as well as impaired judgment

পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সে, আরেকবার শরীরে প্রবেশ করাল মাদকতা। 

পুরো ব্যাপারটা কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র, আর তারপর, মার্থা অনুভব করলো মাথা আবার পাতলা হয়ে গেছে, শরীর ভরে গেছে নতুন শক্তিতে। এয়ারপ্যাকটা চেক করে দেখতে হবে, যেটার অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। এসব ভেবে হেসে উঠলো সে। 

আর পরমূহুর্তে ভয়ে কেঁপে উঠল। পৃথিবীর কোনো কিছুই তাকে এতটা বেসামাল করেনি, যতটা করেছে এই মাদক। তার জীবন নির্ভর করছে কতটা নিয়ন্ত্রিতভাবে সে চলছে। তার চলার জন্য মেথ-র দরকার ঠিকই, কিন্তু এর হাতে সে নিজের দ্বায়িত্বভার ছেড়ে দিতে পারে না। ফোকাস! এখন সর্বশেষ এয়ারপ্যাকটা পরিবর্তনের সময়। আর সেটা বার্টনের এয়ারপ্যাক। “অক্সিজেন আছে মাত্র ৮ ঘণ্টার কম বেশি, আমাকে পাড়ি দিতে হবে ১২ মাইল”। সে নিচুস্বরে বলল, “আমি এটা এই মূহুর্তে শেষ করব।” 

যদি না তার গা চুলকায়, এবং মাথার ভেতরটা এলোমেলো হয়ে যায় এবং মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনা চতুর্দিকে ছড়িয়ে যায়। 

স্বপ্ন রিয়েল টাইম এ দেখা যায় না, তাকে বলা হয়েছিল। তুমি যখন জেগে উঠবে উঠবে করছ, ঠিক সেই মূহুর্তে একটা স্বপ্ন শুরু হয়, আর জেগে ওঠার আগ পর্যন্ত চলে জটিল এই প্রক্রিয়া। মনে হয়, যেন অনন্তকাল ধরে স্বপ্নটা চলছে, কিন্তু আসল ঘটনা, তোমার স্বপ্নের ব্যাপ্তি খুবই সামান্য, শুধুই সামান্য কয়েক সেকেন্ড ধরে চলা অবাস্তবতা। এখানে এইমূহুর্তে এটাই হচ্ছে হয়তো। 

তার হাতে একটা কাজ আছে, সেটা তাকে শেষ করতেই হবে। ল্যান্ডারে ফেরত যেতে হবে তাকে, পৃথিবীবাসীকে জানাতে হবে, যে তারা আর একা নয়। আরেব্বাস, আগুন জ্বালানোর পর সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে সে দাঁড়িয়ে! 

অথবা হতে পারে, সে এতটাই উত্তেজিত যে, IO নামক একটা সত্তা তার হ্যালুসিনেশনের ফসল ছাড়া আর কিছুই নয়। এতটাই উত্তেজিত যে, নিজের মস্তিষ্কের কল্পনার জালে সে নিজেই জড়িয়ে গেছে। 

যেটা তাকে একটা ভয়ংকর ব্যাপার মনে করিয়ে দিল, যেটা হয়তো ভাবার কথা সে কল্পনাই করতো না। ছোটবেলা থেকেই সে একা। বেস্টফ্রেন্ড তো দূরের কথা, তার জীবনে কোনো বন্ধুই হয়নি। মেয়েবেলার বেশিরভাগ সময় তার কেটেছে বই-র ভেতর ডুবে, নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত ছিল সে, অনেকটা সময়। সুতরাং, এটা জরুরি নিশ্চিত করা যে, IO কোনো বহির্জাগতিক সত্তার কণ্ঠ না অন্য কিছু। 

কীভাবে প্রমাণ করবে সে এটা? 

IO-এর ভাষ্যমতে, সালফার না কি triboelectric। সে হিসেবে, যদি এখানে কোনো ইলেকট্রনিক ঘটনা ঘটে থাকে, তবে এর বস্তুগত কোনো প্রকাশ থাকবে। 

মার্থা ধীরে ধীরে তার হেলমেটে ইলেকট্রিক চার্জ দেখার মতো করে সেট করল, আর সেটার ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দিল এর সীমা পর্যন্ত। 

তার সামনের সমতল ভূমি একটু ঝাড়া দিয়ে উঠলো। পরক্ষণেই, ভরে গেল কোনো পরিরাজ্যের রঙে। আলো, প্রচুর আলো, যা প্রতি পালসের সাথে নির্গত হচ্ছে সালফারের পাথরগুলির ভেতর থেকে। পটভূমির রঙ পরিবর্তিত হয়েছে প্যাস্টেলে আঁকা কোনো ছবির মতো, মলিন লাল থেকে গাঢ় নীলে। 

ভূগর্ভস্থ ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডের মতোই, আলোক ছটার সারি চোখে পড়ছিল। যেগুলো অনেকটা, সার্কিটের অবয়ব লাগছিল তার কাছে। এগুলো ছড়িয়ে পড়ছে চতুর্দিকে, একসাথে মিলিত হয়েছে, কয়েক জায়গাতে কাটাকুটিও করেছে, কিন্তু কোনোটাই তার উপর দিয়ে যায়নি। বরং এদের শেষ হয়েছে, স্লেজে এসে। বার্টনের মৃতদেহ নিয়নের মতো জ্বল জ্বল করছিল। আর সালফার ডাই অক্সাইডের তুষার পূর্ণ তার মাথা এত উজ্জ্বল ছিল যে, সেটা সূর্যের ন্যায় আলো ছড়াচ্ছিল। 

সালফার যদি triboelectric হয়, তবে ঘর্ষণে এর ভেতর চার্জ তৈরি হবার কথা। সে কতক্ষণ ধরে এই স্লেজ টেনে চলেছে বৃহস্পতির এই চাঁদের বুকে, নির্ঘাত বেশ ভালো পরিমাণ চার্জ তৈরি হয়েছে ধারণা করা যায়। 

আচ্ছা, সে যেটা দেখছে তা একটি বস্তুগত প্রকাশ বলা যায়। এর থেকে ধারণা করা যায়, IO আসলেই একটা যন্ত্র,  একটা triboelectric অ্যালিয়েন ডিভাইস। চাঁদের আকৃতির এই জিনিসটা কতশত বছর আগে কোনো ঈশ্বর সমসত্তা তৈরি করেছিলেন কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে, তা জানা না থাকলেও, এটা তাঁর সাথে যোগাযোগ তৈরি করেছে। আসলে বিদ্যুত দিয়ে অনেক কিছু করা যায়। 

ছোটো একটা সার্কিট ভেসে ভেসে মার্থার কাছে পৌঁছালো। কিন্তু যখনই, সে এক পা তুললো… সেটা গেলো ভেঙে। পা নিজের জায়গায় নিতেই আবার নতুন করে সার্কিট তৈরি হলো। নতুন সারির জন্ম হল যখন সে দাঁড়ালো। আসলে তার সংস্পর্শে আশা মাত্রই, সার্কিটগুলি ভেঙ্গে আবার নতুন করে তৈরি হচ্ছিল। 

অন্যদিকের বার্টনের স্লেজটা IO-এর সালফার আস্তরিত ভূমির সাথে অবিরাম সংযোগ রক্ষা করে চলছিল। বার্টনের মুখমন্ডলে তৈরি হওয়া গর্তটিই হয়তো তার মস্তিষ্কের সাথে যোগাযোগের হাইওয়ে হবে। আর, সেই গর্তটা সে সালফার ডাই-অক্সাইড দিয়ে পূর্ণ করে দিয়েছে। কনডাক্টিভ আর সুপারকুল্ড, সে আসলে IO-র কাজটাই সহজ করে দিয়েছে। 

এটা একটা সম্ভাব্য হাইপোথিসিস যে, এতক্ষণ তার সাথে কথা বলে চলা কণ্ঠটি আসলে সত্য, তার কোনো মনোজাগতিক হ্যালুসিনেশন নয়। এটাও প্রতিষ্ঠিত যে, IO তার সাথে যোগাযোগে সক্ষম একটা মেশিন। যদি তাই হয়, তবে এর সৃষ্টিকর্তা কে? 

ক্লিক

— “IO, শুনতে পাচ্ছো কি?”

— “Calm on the listening ear of night. Come Heaven’s melodious strains. Edmund Hamilton Sears.”  

— “হ্যাঁ, চমৎকার, সুন্দর। শোন, একটা বিষয় আমি তোমার কাছ থেকে একান্তই জানতে চাই, তোমাকে সৃষ্টি করেছে কে?” 

— “তুমি, করেছ।”

সামান্য দুষ্টামি মিশ্রিত কন্ঠে মার্থা বলল, “তো, আমিই তোমার সৃষ্টিকর্তা, ঠিক?” 

— “হ্যাঁ!” 

— “তাহলে, যখন আমি ঘরে থাকি, আমি দেখতে কেমন?” 

— “যেমনটা তুমি সবসময় দেখতে, তেমনই।”

— “আমি কি অক্সিজেন ব্যবহার করি, না মিথেন? আমার কি অ্যান্টেনা আছে? শুঁড়? পাখা? কয়টা পা আমার? চোখই বা কয়টা? কয়টা মাথা আমার?” 

— “যদি মনে করো, তোমার যতগুলো, ঠিক ততগুলোই!”

— “এখন, আমার মত কতজন আছে এখানে?”

— ”একজনই”,  এক মূহুর্তের স্তব্ধতার পর পুনরায়, “এইমুহূর্তে”।

— “আমি এখানে ছিলাম, মানে আমার মতো কেউ একজন। চলমান জলজ্যান্ত কোনো বুদ্ধিমান সত্তা। তারপর সে এই জায়গা ছেড়ে চলে যায়।”

সে আবার শুরু করে, “কিন্তু কতশত বছর আগে? কত…আগে!?” 

— “অনেক অনেক আগে। একাকিত্ব। অনেক আগেই!”

টানো, হেঁচড়াও, হেঁচড়াও, টানো, হেঁচড়াও, টানো। কত শতাব্দী ধরে হেঁটে চলেছে সে? মনে হচ্ছে অনেক। বেলা ফুরিয়ে রাত নেমেছে আবার। মার্থার মনে হলো, তার হাতগুলো সকেট থেকে খুলে চলে আসবে। সত্য বলতে কি, তার আসলে বার্টনকে ফেলে আসাই উচিত ছিল। পুরো জীবনে বার্টন এমন কিছু বলেনি, যার থেকে মনে হয় সে আসলে মার্থাকে প্রাধান্য দেয় বা সমর্থন করে। IO-এর বুকে বার্টনকে কবর দেওয়াটা একটা ভাল অপশন ছিল। কিন্তু মার্থা এসব কিছুই বার্টনের কথা মাথায় রেখে করছে না। সে ভাবছে নিজেরই কথা। যাতে, দিনশেষে তাকে কম স্বার্থপর মনে হয়। সে এটা করছে, যাতে অন্যদের মনে তার প্রতি মায়া জন্মায়। সে যে গৌরব আর সুখ্যাতির উর্ধ্বে উঠে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

অবশ্য, ব্যাপারটা নিজেই বেশ স্বার্থপর। তাতে কী? তুমি নিজেকে ক্রশের সাথে গেঁথে ফেললেও, সেটা স্বার্থপরতার নিদর্শন হয়ে থাকবে। 

— “তুমি কি এখনো আছো, IO?” 

ক্লিক! 

— “শুনছি বলো।”

— “তোমার ফাইন কনট্রোল সম্পর্কে একটু ধারণা দাও। তোমার কি ক্ষমতা? তুমি কি আমাকে ল্যান্ডারের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিতে পারো? না কি ল্যান্ডারটাকেই আমার কাছে নিয়ে আসতে পারবে? অরবিটার পর্যন্ত যেতে সাহায্য করতে পারবে? আমাকে কি কিছু অক্সিজেন দিতে পারবে?”

— “Dead egg, I lie. Whole. On a whole world, I cannot touch. Plath.”

— “তুমি দেখছি তেমন কাজেরও নও, তা নয় কি?” 

কোনো উত্তর এলো না, এমন না যে, সে কোন উত্তর আশাও করছিল। সে তার টোপোমিটারগুলো চেক করা শুরু করলো, এবং ল্যান্ডারের আট মাইলের ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করল। এমনকি তার ফোটোমাল্টিপায়ারের মাধ্যমে সেটাকে দেখাও যাচ্ছিলো, হরাইজনে একটা মলিন বিন্দুর মতো। ফোটোমাল্টিপ্লায়ার, দারুণ একটা জিনিস। সূর্য এখানে পৃথিবীতে পূর্ণিমা চাঁদের মতো আলো দেয়। ল্যান্ডারটিতে একটা এয়ারলক অপেক্ষা করছে তার গ্লাভ আবৃত হাতের অপেক্ষায়। 

টানো, হেঁচড়াও, টানো। মার্থা তার মাথার ভেতর বাড়ে বাড়ে অঙ্কটা কষতে লাগল। তাকে হয়তো আর তিন মাইল হাঁটতে হবে, আর যথেষ্ট অক্সিজেনও রয়েছে তার। ল্যান্ডারের নিজস্ব বায়ু উৎপাদন ব্যবস্থা আছে। নিজেকে সে যতটা অকর্মা ভেবেছিল, ততটা সে নয়। 

ক্লিক ! 

— “শক্ত করে নিজেকে ধরো !”

— “কেন?” 

তার পায়ের নিচের মাটি হুট করে সরে গেল, বেসামাল হয়ে পড়লো সে। 

যখন, ভূমিকম্প থামলো, অস্থিরভাবে উঠে দাঁড়ালো মার্থা। তার সামনে ভূমি অগোছালো, যেনো একটা দানব আপন মনে পা ফেলে আবার উঠিয়ে নিয়ে চলে গেছে। তার ল্যান্ডার নির্দেশক রূপালি বিন্দুটিও উধাও। মার্থা যখন তার ভাইজরের ম্যাগনেফিকেশন চালু করল, অগোছালো মাটি থেকে এবড়োথেবড়োভাবে বেরিয়ে থাকা ল্যান্ডারের  একটা পা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। 

মার্থা এই ল্যান্ডারের নাড়ি-নক্ষত্র চিনতো। সে জানতো এটা বেশ ভঙ্গুর। এটা আর উড়বে না। 

মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো সে, চোখের পলকটুকুও পড়ছে না। কিছুই অনুভব করছে না, আসলে কিছুই হচ্ছে না। 

আস্তে আস্তে সে তার চিন্তাগুলোকে একত্র করল। মনে হয় এটা মেনে নেবার সময় এসেছে যে, সে কোনোদিন নিজের উপর বিশ্বাস করেনি ল্যান্ডার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে। আসলেই না, মার্থা ক্যাভেলসন পারবে না। সে সারাজীবন একজন পরাজিতই থেকে যাবে। মাঝেমাঝে কিছু ব্যতিক্রম ঘটে, যেমন সে অভিযানের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল; সেখানেও সে হেরেছে। অন্তত বড়ো কিছু পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়ে, সে যা চেয়েছিল, তা সে পায়নি। 

কেন এমন হয় তার সাথে? যখনই সে কিছু হয়, তার সাথে খারাপটাই কেন হয়? মনের ভেতর ভেতর, সে শুধুই ঈশ্বরের প্রতি নিজের যত রাগ তা পূরণ করতে চায়, মনোযোগ পাবার জন্য। সে একটা ভীষণ গোলমাল তৈরি করতে চায়, এই মহাবিশ্বের ভেতর একমাত্র গণ্ডগোল হতে চায়। 

এখন সে মনুষ্যজাতির মহাবিশ্বতে নিজেদের ছড়িয়ে দেবার মিশনে পশ্চাতদেশে একটা ছাপ রেখে যাবে। তার ঘটনা কোনো মহাকাশচারী মা তার মহাকাশচারী শিশুদের শোনাবে। তার জায়গায় বার্টন থাকলে, ল্যান্ডারে পৌঁছাতে পারতো। কিংবা হলস থাকলেও। কিন্তু সে, কোনোভাবেই না। 

ক্লিক! 

— “IO তে রয়েছে সৌরজগতের ভেতর সবচেয়ে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি।” 

— “তুমি আমাকে আগে সতর্ক করলে না কেন?”

— “বুঝতে পারি নি।”

এখন তার আবেগগুলো পুরোদমে ফিরে এসেছে। মনে হচ্ছিল, উন্মত্তের মতো ছুটে গিয়ে সব ভেঙেচুড়ে গুঁড়িয়ে দিতে। 

— “গোবরগণেশ!” সে চিৎকার করে উঠল, “বোকা যন্ত্র কোথাকার? কি কাজের তুমি?” 

— “তোমাকে দিতে পারি, অনন্ত জীবন। আত্মার যোগাযোগ। অসীম প্রসেসিং ক্ষমতা। বার্টনকেও দিতে পারি, একই।”

— “অ্যাঁহ?” 

— “After the first death. There is no other. Dylan Thomas.

— “কী বলতে চাও তুমি?”  

কোনো প্রতুত্তর নেই। 

— “চুলোয় যাও বালের মেশিন, কি বলতে চাচ্ছো তুমি?”

তারপর শয়তান, যিশুকে পবিত্র নগরীতে নিয়ে গেল এবং স্থাপন করল মন্দিরের সর্বোচ্চ বিন্দুতে। এবং তাকে বলল, “তুমি যদি ঈশ্বর পুত্র হও, তবে নিজেকে নিচু করো। কারণ লেখা আছে, তিনি তার ফেরেশতাদের দ্বায়িত্ব দেবেন তোমার বিষয়ে। এবং তাঁরা তোমাকে তাঁদের হাতে তুলে নেবে”। বার্টন যে শুধু স্ক্রিপচার থেকে কোট করতে পারে এমন না, এজন্য তোমার ক্যাথলিক হবার দরকারও নেই।

মার্থা আসলে নিশ্চিত ছিল না, এটাকে কী বলবে। কোনো আগ্নেয় ঘটনা হবে হয়তো। ২০ মিটার বিস্তৃত, খুব বেশি উঁচুও নয়, এমন জায়গাকে খাড়ি বলাটা ভালো হবে। সে এর একেবারে কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল। আর তার নিচে বইছিল, গলিত সালফারের স্রোত। সব হয়তো গিয়ে টারটারাসেই মিলবে। 

মার্থার মাথা সহসাই ব্যাথা করে উঠল। 

IO-এর মতে, যেমনটা সে বলেছিল, যদি মার্থার ভেতরে নিজেকে বিসর্জন দেয়, তবে সে তাকে শুষে নিতে পারবে, তার নিউরাল প্যাটার্ন কপি করে নতুন জীবন দিতে পারবে। বেঁচে থাকার একটা রূপান্তর বলা যায়, কিন্তু বেঁচে থাকা নয়। “বার্টনকে বিসর্জন দাও!”, সে বলেছিল, “নিজেকে বিসর্জন দাও।”

— “শারীরিক কনফিগারেশন, ধ্বংস হয়ে যাবে। নিউরাল কনফিগারেশন, সংরক্ষিত থাকবে, হয়তো।

— “হয়তো?” 

— “বার্টনের বায়োলজিক্যাল কার্যকলাপে কমতি ছিল। তার নিউরাল ফাংশন বোঝাটা, ইমপারফেক্ট।”

— “দারুণ!”

— “হয়তো তো বা নয়।”

— “বুঝতে পেরেছি।”

খাড়ির নিচ থেকে উত্তাপ উপরে উঠছে। নিজের স্যুটের HVAC সিস্টেম-র দ্বারা সুরক্ষিত থাকা সত্ত্বেও, মার্থা সামনে আর পিছনের তাপমাত্রার পার্থক্যটা বুঝতে পারছিল। এটা ছিল, শীতের রাতে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি। 

তারা অনেক সময় কথা বলেছিল, কিংবা বললে ভালো হয়, আলোচনা করেছিল। 

শেষমেশ মার্থা বলে উঠলো, “তুমি কি মোর্স কোড বোঝ? কিংবা অর্থোডক্স স্পেলিং?” 

— “বার্টন যা বুঝতো, আমিও, তাই বুঝি!”

— “দোহাই লাগে, হ্যা অথবা না এর একটা উত্তর দাও!” 

— “বুঝি”

— “ভালো, তাহলে আমরা একটা ডিল করতে পারি।”

maxresdefault
যন্ত্র না কি বার্টন! কাকে খুঁজতে গিয়ে মার্থা নিজেই হারিয়ে যাচ্ছে?

তারাভরা আকাশের  দিকে তাকাল মার্থা, অরবিটালটা উপরে ওখানেই কোথাও আছে। একটা আক্ষেপ থেকে গেল, হলস-কে গুডবাই আর সবকিছুর জন্য একটা ধন্যবাদ না জানানোর। IO-এর বাধায় সে চিন্তা আর এগুলো না। এতে নাকি অগ্নুতপাত কিংবা ভূমিকম্প হতে পারে। যা লেক স্টিক্সে ব্রিজ তৈরির ফলে যে ভূমিকম্প হয়েছিল তার থেকেও বড়ো হবে। সে আসলে দুইটা আলাদা যোগাযোগের কোনো গ্যারান্টি দিতে পারে না। 

আয়ন ফ্লাক্স টিউব, কোনো জায়গা থেকে বাঁকা হয়ে এসে বৃহস্পতি নর্থ পোলে চলে গেছে। আর তার ভাইজরে সেটা দেখাচ্ছে অনেকটা দেবতার তলোয়ারের মতো। 

দেখতে দেখতেই, সেটা ঝিরঝির করে লাফাতে লাগল। মিলিয়ন ওয়াটের পাওয়ার একটা সংকেতের তালে নেচে চলেছে, যা পৃথিবীর পৃষ্ট থেকে রিসিভ করা যাবে। সৌরজগতের সকল রেডিয়ো আর ব্রডকাস্টে ধরা দেবে এই সংকেত। 

THIS IS MARTHA KIVELSEN, SPEAKING FROM THE SURFACE OF IO ON BEHALF OF MYSELF, JULIET BURTON, DECEASED, AND JACOB HOLS, OF THE FIRST GALILEAN SATELLITES EXPLORATORY MISSION. WE HAVE MADE AN IMPORTANT DISCOVERY…

বার্টনকেই আগে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। মার্থা স্লেজটাকে সামান্য ধাক্কা দিল, আর সেটা উড়ে গেল শূণ্যস্থানে। মাঝপথে সেটা সামান্য ধাক্কা খেল, তারপর মৃতদেহটা ডুবে যায় কালো অন্ধকারে। 

ব্যাপারটা খুব একটা সুখকর হলো না দেখতে। তাও, 

— “একটা ডিল হলো ডিলই”। সে সামনে দাঁড়ালো, হাত প্রসারিত করে দিল দুই পাশে। বুকভরে শ্বাস নিল কয়েকবার। হয়তো আমি কোনোভাবে বেঁচে যাবো, ভাবলো সে। বার্টনের দেহ ইতোমধ্যেই IO-এর প্রশান্ত মনে ডুবে গেছে আর আমার জন্য অপেক্ষা করছে, অনেকটা আলক্যামিকাল ব্যক্তিত্ত্বে বিবাহনুষ্ঠানের মতো। বেঁচেও থাকতে পারি, কেই বা বলতে পারে? সবই সম্ভব।

হয়তো। 

একটা দ্বিতীয় কোনো সম্ভাবনা থাকতে পারে। হতে পারে এটা আবার কোনো দৃষ্টিভ্রম। হতে পারে তার মস্তিষ্কের শর্টসার্কিটের ফলে শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে, বিভিন্ন কেমিক্যাল ছুঁড়ে দিচ্ছে বিভিন্ন দিকে। পাগলামি সব। কিংবা মৃত্যুর পূর্বে শেষ একটা স্বপ্ন। মার্থা আর বিচার করার অবস্থায় নেই। 

সত্য যাই হোক, এর কোনো বিকল্প নেই এবং সেটা বোঝার উপায় একটাই। 

সে ঝাঁপাল এবার। 

কিংবা, উড়ে গেল… 


মূল: ‘The Very Pulse of The Machine’ by মাইকেল সনউইক,
অনুবাদ: ঋভু দত্ত,
পরিমার্জন ও সম্পাদনা: মো. তৌহিদুজ্জামান

Total
1
Shares
Leave a Reply

Your email address will not be published.