আমরা

‘বিজ্ঞানপ্রিয়’ বাংলাদেশের একটি অনন্য বিজ্ঞান কনটেন্ট-ভিত্তিক প্লাটফর্ম। ২০১৮ সালে ফেসবুক গ্রুপের হাত ধরে বিজ্ঞানপ্রিয়র যাত্রা শুরু। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চমৎকার সব প্রামাণিক ইনফোগ্রাফিক তথ্য, ভিডিওচিত্র এবং ম্যাগাজিনসহ সময়োপযোগী নানা স্থায়ী-অস্থায়ী উদ্যোগ বিজ্ঞানপ্রিয়কে পৌঁছে দিয়েছে প্রায় ৭ লক্ষাধিক বিজ্ঞানপ্রেমীর মস্তিষ্কে।

যেভাবে এলো খ্রিষ্টাব্দ, খ্রিষ্টপূর্ব কনসেপ্ট!

মুহাম্মাদ শাওন মাহমুদ
The origin of B.C. and A.D.

আজ থেকে অনেক বছর আগে
এক গ্রামে বাস করত এক দরিদ্র রাজা (!)

ছোটবেলায় দাদা-দাদির কাছ থেকে কূপিবাতি জেলে পুরনো দিনের গল্প শোনেনি এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। প্রত্যেকটা গল্পের একটা সাধারণ বুলি ছিল, ‘আজ থেকে অনেক বছর আগে’। অর্থাৎ ‘আজ’ শব্দটা এখানে রেফারেন্স বা প্রমাণ সময় হিসেবে কাজ করছে। আজকের সাপেক্ষে ‘বহু বছর আগে’ ব্যপারটা আমাদের গল্পের সময়ের অবস্থানটা অনুধাবন করতে সাহায্য করে।

মধ্যযুগ শুরু হবার কিছু আগে (যিশু খ্রিষ্টের জন্মের পরবর্তী ৪৭৬-১০০০ বছর সময়কালকে মধ্যযুগ বলা হয়) হঠাৎ করে ইউরোপের বাসিন্দারা গণিতচর্চার প্রতি বড্ড মনোযোগী হয়ে উঠেছিল। যদিও তাদের উদ্দেশ্য গণিতে এ প্লাস পাওয়া ছিল না, বরং ইস্টার কবে পালন করবে সে তারিখটা নিখুঁতভাবে খুঁজে বের করাই ছিল তাদের একমাত্র প্রেরণা। ইস্টার হল যিশু খ্রিষ্টের প্রত্যাবর্তন বা পুনরুত্থান দিবস। অর্থাৎ ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণের তিন দিন পরে মৃতাবস্থা থেকে বেঁচে ওঠা তথা পুনরুত্থানের অলৌকিক ঘটনাটিকে স্মরণ করার জন্য পালিত বাৎসরিক ধর্মীয় উৎসব। ইস্টার নির্ধারণের উদ্দেশ্যে সময় গণনার নানা পন্থার আইডিয়া দিতে লাগলেন তৎকালীন খ্রিষ্টীয় পণ্ডিতেরা। তার মধ্যে একজন ছিলেন পোপ ডায়োনাইসিয়াস এক্সিগাস (অনেকে ডেনিস সম্বোধন করেন)।

Dionysius Exiguus
খ্রিষ্টাব্দ, খ্রিষ্টপূর্ব ধারণার প্রবর্তক ডায়োনাইসিয়াস এক্সিগাস

তিনি যিশু খ্রিষ্টের জন্ম বছরকে ১ ধরে গণনা শুরু করার ধারণা দেন। বছরটিকে তিনি Anno Domini Nostri Jesu Christi (A.D.) বা In the year of the Lord বা আমাদের ঈশ্বর যিশু খ্রিস্টের বর্ষ বলে সম্বোধন করেন [Source]। যদিও যিশু খ্রিষ্টের জন্মের ৩২৫ বছর পর ডায়োনাইসিয়াস কিভাবে তাঁর জন্মসাল নির্ণয় করলেন তার কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। ডায়োনাইসিয়াসের এই পদ্ধতি সবার পছন্দ হল এবং এই পদ্ধতি অনুসরণ করে বহু জল্পনাকল্পনা শেষে মহাবিষুব তথা মার্চ ইকুইনক্সের পরবর্তী প্রথম পূর্ণিমার পরের প্রথম রবিবার’কে পুনরুত্থান পার্বণ বা ইস্টার হিসেবে নির্ধারিত হল এবং ইস্টার হয়ে গেল ‘ইস্টার সানডে’ [Source]। কিন্তু এটি যিশু খ্রিষ্টের প্রত্যাবর্তনের একটি সম্ভাব্য লগ্ন। বাইবেল অনুযায়ী আদৌ সেদিনই যে যিশু খ্রিষ্ট প্রত্যাবর্তন করেছিলেন কি না এ নিয়ে এখনও রয়েছে তর্ক-বিতর্ক।

এদিকে তার কয়েক’শ বছর পর গণনা পদ্ধতি তুলনামূলক নির্ভুল হওয়ায় সময়ের সাথে পোপ ডায়োনাইসিয়াসের A.D. পদ্ধতি বিশ্বজনীন সময় গণনা পদ্ধতিতে পরিণত হল এবং যিশু খ্রিষ্টের জন্মলগ্নের আগের সময়কালকে (টাইমলাইন) Before Christ (B.D.) বা ‘খ্রিষ্টপূর্ব’ দ্বারা এবং যিশু খ্রিষ্টের জন্মলগ্নের পরের সময়কালকে Anno Domini (A.D.) বা খ্রিষ্টাব্দ দ্বারা চিহ্নিত করা হল। যেমন মিশরের পিরামিড নির্মাণ করা হয়েছিল আনুমানিক 2500-2490 B.C. তে অর্থাৎ যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ২,৫০০ থেকে ২,৪৯০ বছর আগে। আবার, বাংলাদেশ স্বাধীন হয় 1971 A.D. তথা যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ১,৯৭১ বছর পরে। পরবর্তীতে ১৫৮২ সালে গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের প্রচলন শুরু হলে সেখানেও সময় গণনায় BC, AD পদের ব্যবহার শুরু হয় [Source]

যেভাবে এল BCE/CE টার্ম

সবকিছু ঠিকই ছিল। ঝামেলাটা হল সপ্তদশ শতাব্দীতে যখন কিছু জার্মান ইহুদি স্কলার্স B.C. ও A.D. পদের অন্তর্ভুক্ত ‘Christ’ শব্দটির বিরুদ্ধে সমালোচনা করেন। তারা মূলত প্রচ্ছন্নভাবে যিশুখ্রিষ্টের সাথে ‘লর্ড’ শব্দটি ব্যবহার করতে অসম্মতি জানান। কিন্তু তারা সরাসরি এই বিষয়টি তুলে না ধরে ইহুদী প্রণীত হিব্রু ক্যালেন্ডারের তুলনায় প্রচলিত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের দুর্বলতা তুলে ধরেন এবং হিব্রু ক্যালেন্ডারকে সামনে রেখে যিশুখ্রিষ্টের জন্ম বছরকে মধ্যবিন্দু ধরে তার আগের সময়কালকে Before Common Era (B.C.E) এবং পরবর্তী সময়কালকে Common Era (C.E.) পদ দুটো দ্বারা চিহ্নিত করেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, হিব্রু ক্যালেন্ডারের সূচনা হয় যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ৩,৭৬১ বছর আগে। অন্যদিকে BC, AD পদের সূচনা হয় যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ৫০০ বছর পরে মধ্যযুগে। এ কারণে খ্রিষ্টীয় ধর্মপুস্তক বাইবেলে BC, AD জাতীয় পদ দুটো দেখা যায় না। আর এ বিষয়টিই সপ্তদশ শতাব্দীতে জার্মান ইহুদিরা একরকম টোপ হিসেবে ব্যবহার করেন। ধীরে ধীরে BC, AD এর পাশাপাশি B.C.E., C.E এরও ব্যবহারও বাড়তে থাকলো।

শূন্য বর্ষ বলে কি কিছু আছে?

শূন্য বর্ষ বলে আদোতে কিছু নেই। যৌক্তিকভাবে ১ খ্রিষ্টাব্দের আগের বছর ‘০ বর্ষ’ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু গ্রেগরীয়ান ক্যালেনডারের দিকে তাকালে ১ খিষ্টাব্দের (A.D.) আগের বছর সরাসরি ১ খ্রিষ্টপূর্ব (B.C.) হিসেবে পাওয়া যায়। এর কারণ হল, ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দেও পশ্চিম ইউরোপের মানুষেরা ‘শূণ্য’ সংখ্যা সম্পর্কে জেনে ওঠেনি। ৪ খ্রিষ্টপূর্বে সর্বপ্রথম মায়ান সভ্যতা শূণ্য আবিষ্কার করলেও তখনকার শূণ্যের ধারণার সাথে বর্তমান শূণ্যের ধারণার পার্থক্য ছিল। বর্তমানে আমরা শূণ্য বলতে যা বুঝি তার ধারণা দেন প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিত ব্রহ্মগুপ্ত, ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে। আর সেই ধারণা ইউরোপের মধ্যযুগীয় খ্রিষ্টানদের মধ্যে পৌঁছায় আনুমানিক একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতকে। সুতরাং শূণ্য বর্ষ বা শূণ্য সাল থাকাটা অস্বাভাবিক।

A.D. এর পূর্ণরূপআফটার ডেথবলা চলে?

বর্তমানে অনেকে ভুলবশত A.D. এর পূর্ণরূপ হিসেবে আফটার ডেথ তথা যিশুখ্রিষ্টের মৃত্যুর পরবর্তি টাইমলাইনকে বোঝান, যা সময় গণনার ক্ষেত্রে বিশাল একটা ভুল। কেননা A.D. এর গণনা শুরু হয় যিশুখ্রিষ্টের জন্মলগ্ন থেকে। মৃত্যুলগ্ন নয়। এক্ষেত্রে যদি A.D. এর পূর্ণরূপ আফটার ডেথ দাবি করা হয়, সেক্ষেত্রে যিশুখ্রিষ্টের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ৩৩-৩৬ টি বছর টাইমলাইন থেকে গায়েব হয়ে যাবে। সুতরাং আফটার ডেথ বলে আদোতে কোন পদের অস্তিত্ব নেই।

পরিশেষে কোনটা বেশি গ্রহণযোগ্য?

এ পর্যন্ত বহু সংস্থা এবং ব্যক্তিবর্গ B.C.E., C.E টার্ম দুটো ব্যবহারে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন [Source]। কেননা BC, AD এর সাথে ব্যপকভাবে ধর্মীয় অনুভূতি জড়িত। এই তারিখ গণনা পদ্ধতি যাতে অন্য ধর্মালম্বিরাও স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পারে এ কারণে বর্তমান বিশ্বে BC, AD পদ্ধতির তুলনায় B.C.E., C.E পদ অধিক গ্রহণযোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। তাছাড়া কিছু কিছু স্কলার্স Common Era (C.E.) এর পরিবর্তে Vulgar Era (V.E.) পদটিও ব্যবহার করেন। সপ্তদশ শতকে Vulgar শব্দের অর্থ ছিল ‘Ordinary’ বা সাধারণ। মজার ব্যপার হল, জার্মান জ্যোতির্বিদ জোহানেস কেপলার সপ্তাদশ শতকে তাঁর লেখা একটি পুস্তকে Common Era পদের স্থলে Vulgar Era পদ ব্যবহার করেছেন।


Relevant Sources:
Concept of Gregorian Calendar
Concept of Hebrew Calendar
Does zero year really exist?

Total
0
Shares
Leave a Reply

Your email address will not be published.