আমরা

‘বিজ্ঞানপ্রিয়’ বাংলাদেশের একটি অনন্য বিজ্ঞান কনটেন্ট-ভিত্তিক প্লাটফর্ম। ২০১৮ সালে ফেসবুক গ্রুপের হাত ধরে বিজ্ঞানপ্রিয়র যাত্রা শুরু। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চমৎকার সব প্রামাণিক ইনফোগ্রাফিক তথ্য, ভিডিওচিত্র এবং ম্যাগাজিনসহ সময়োপযোগী নানা স্থায়ী-অস্থায়ী উদ্যোগ বিজ্ঞানপ্রিয়কে পৌঁছে দিয়েছে প্রায় ৭ লক্ষাধিক বিজ্ঞানপ্রেমীর মস্তিষ্কে।

স্ট্যাসি সিওয়েলঃ এক হৃদয়স্পর্শী ফুসফুস ট্রান্সপ্লান্টের গল্প!

মুহাম্মাদ শাওন মাহমুদ
stacy sewel double lung transplant

জানুয়ারী, ১৯৯৩।

ডাক্তার যখন জানালেন স্ট্যাসি’র ফুসফুসের দুটো লোবের ট্রান্সপ্লান্টেশন হলে মেয়েটা হয়ত এ যাত্রা বেঁচে যাবে, অবিলম্বে বাবা-মা দুজনই অর্ধেক অর্ধেক করে নিজ নিজ ফুসফুস ডোনেট করতে রাজী হয়ে গিয়েছিলেন। সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত ২২ বছর বয়সী স্বপ্নবাজ তরুণী স্ট্যাসি সিওয়েল দীর্ঘদিন ভালভাবে শ্বাস নিতে পারছিলেন না। শ্বাসনালী থেকে ফুসফুস যেন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে আছে আঠালো চ্যাটচ্যাটে মিউকাসে। দীর্ঘদিনের ইনফেকশনে ফুসফুসের বেশিরভাগ অংশই অকেজো হয়ে পড়েছে।

ডাক্তার সতর্ক করলেন, ফুসফুস ট্রান্সপ্লান্টেশন কেবলমাত্র স্ট্যাসিকে বাঁচানোর একটা অনিশ্চিত প্রচেষ্টা। রোগী কতদিন বাঁচবে এবং ফুসফুসের লোব কেটে নেওয়ার পর ডোনার কতদিন বাঁচবেন তারও কোন সঠিক নিশ্চয়তা নেই। স্ট্যাসির বাবা-মা দুজনই সম্মতি দিলেন, এতে তাদের মেয়ে যদি অন্তত ১ দিনও পৃথিবীর আলো দেখতে পায়, তবুও যেন ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা হয়।

আমরা দ্বিধাহীনভাবে এটা করতে চাই, আমাদের বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই,বারবারা সিওয়েল, স্ট্যাসির মা।

২৯ জানুয়ারী ১৯৯৫, ক্যালিফর্নিয়ার ইউএসসি ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে তিন অপারেশন বেডে তিন জনের ফুসফুসের অস্ত্রপচার করা হয়। বাবা মা দুজন ডোনারের দেহ থেকেই অর্ধেক অর্ধেক করে কেটে নেয়া হয় ফুসফুসের দুটো লোব। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মত একই সাথে একই পরিবারের ৩ জনের ফুসফুসে অস্ত্রপচার হয়, যা মেডিকেল বিজ্ঞানের জন্য একটা স্মরণীয় দৃষ্টান্ত। এই অস্ত্রপচারটি একই সঙ্গে প্রথমবারের মত সিস্টিক ফাইব্রোসিসের চিকিৎসায় ফুসফুস ট্রান্সপ্লান্ট সার্জারি ছিল। অর্থাৎ দিন শেষে কেউই জানত না, এর পর কি ঘটবে।

অপারেশনের ১ মাস পর, ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন স্ট্যাসি। তাকে যখন তার অনুভূতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি বলেছিলেন,

“একজন সাধারণ মানুষের মত শ্বাস নিতে পারছি, এর থেকে বেশি প্রশান্তির অনুভূতি হয় না। মুক্ত বাতাসকে খুবই ভালবাসি। শ্বাস-প্রশ্বাস পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর অনুভূতি, যা আমি কল্পনা করতে পারিনি।”

কিন্তু সব সুখ চিরস্থায়ী হয় না।

এই অপারেশনটির পর স্ট্যাসি পূর্বের তুলনায় আরো বেশি উদ্যমী হয়ে উঠেছিলেন। অ্যান্টেলোপ ভ্যালি কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ল্যানক্যাস্টারের মারভিন স্টোরে সেলস ক্লার্ক হিসেবে পার্ট-টাইম জব শুরু করেন তিনি। সেই সাথে অধীর আগ্রহের সাথে সময় দিতেন নানা সামাজিক কর্মকান্ডেও। ব্যপক নামডাকও অর্জন করে ফেলেন ততদিনে। বাবা-মা’য়ের নিরূপম ত্যাগ আর মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা মেয়ের সোশ্যাল ওয়ার্কের দরুন অল্প কিছু ভক্তও জুটে যায় সিওয়েল পরিবারের।

কিন্তু বিধিবাম, এই প্রসন্নতা, উদ্যম আর নিশ্বাসের প্রশান্তি যেন ছিল চোখের পলকের। অপারেশনের দু বছরের মাথায় জন্মদিনের মাত্র ১ দিন আগে পুনরায় হাসপাতালমুখি হতে হয় স্ট্যাসি সিওয়েল’কে। এবার সরাসরি ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া। ইনফেকশনে ছেয়ে গেছে মেয়ের বুকের ভেতর থাকা বাবা-মায়ের ফুসফুসের অংশটুকুও। এবার ভক্তদের সাথে মিলেও কিছু করতে পারলেন না সিওয়েল পরিবার। যেখানে দেহের ইমিউনিটিই নিরব, সেখানে চিকিৎসা বিলাসিতা।

পহেলা এপ্রিল ১৯৯৫, নিজের ২৪ তম জন্মদিনে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান স্ট্যাসি সিওয়েল।

“আমার মেয়েটা এই শেষ দুটো বছর যতটা উদ্যম নিয়ে বেঁচে ছিল, আমি মনে করি ততটা বেশিরভাগ মানুষ তাদের পুরো জীবনে বাঁচে না।” – মৃতুর ১০ দিন আগে বলেছিলেন স্ট্যাসির মা।

আর্থিক সংকটের মুখে স্ট্যাসির মৃত্যুর পর তার পরিবার তাকে সৎকারের জন্য কিছু অনুদান আহ্বান করেন। ইউএসসি ইউনিভার্সিটি হসপিটালের পক্ষ থেকে লস অ্যাঞ্জেলসে একটি পাবলিক মেমোরিয়ালের আয়োজন করা হয় ব্রিদিং ওয়ারিয়র স্ট্যাসির জন্যে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপ্রতিম উদাহরণ স্ট্যাসি সিওয়েল এবং তার বাবা-মা, চিকিৎসক না হয়েও যারা চিকিৎসাবিজ্ঞানে রেখে গেছেন অবিস্মরণীয় অবদান।

Total
0
Shares
Leave a Reply

Your email address will not be published.