আমরা

‘বিজ্ঞানপ্রিয়’ বাংলাদেশের একটি অনন্য বিজ্ঞান কনটেন্ট-ভিত্তিক প্লাটফর্ম। ২০১৮ সালে ফেসবুক গ্রুপের হাত ধরে বিজ্ঞানপ্রিয়র যাত্রা শুরু। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চমৎকার সব প্রামাণিক ইনফোগ্রাফিক তথ্য, ভিডিওচিত্র এবং ম্যাগাজিনসহ সময়োপযোগী নানা স্থায়ী-অস্থায়ী উদ্যোগ বিজ্ঞানপ্রিয়কে পৌঁছে দিয়েছে প্রায় ৭ লক্ষাধিক বিজ্ঞানপ্রেমীর মস্তিষ্কে।

চেরোফোবিয়াঃ সুখী হতে বড্ড ভয়!

মুহাম্মাদ শাওন মাহমুদ
Cherophobia the fear of happiness

রামগড়ুরের ছানা, হাসতে তাদের মানা
হাসির কথা বললে বলে, হাসব না-না-না-না!

সুকুমার রায় ছোটদের জন্য কবিতাটি লিখলেও, কবিতার এই ‘রামগড়ুরের ছানা’র বৈশিষ্ট্য কিন্তু বর্তমানে আপনার-আমার আশেপাশের অসংখ্য ব্যক্তিদের সাথে মিলে যায়। জীবনে কিঞ্চিৎ সুখের দেখা মিললেই যেন একরোখা ভীতি জেঁকে বসে, এই বুঝি একরাশ দুঃখ এসে কাঁধে জুড়ে বসলো! ভেবে দেখুন, এমন লোকের সংখ্যা কিন্তু নেহাতই কম নয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি গৌণ মানসিক ব্যাধি, যার নাম “চেরোফোবিয়া”।

ছানা হাসতে তাদের মানা
সুকুমার রায়ের “রামগড়ুরের ছানা”

মান্না দে’র গানটার কথা মনে আছে, “সবাই তো সুখী হতে চায় সবাই সুখী হতে চাইলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই সুখের সংজ্ঞাটাকে আমরা জটিল থেকে জটিলতর করে ফেলি আর নিজেরাও সে সংজ্ঞার জালে আটকা পড়ি। সুখের সমীকরণের মান কারো জন্যই সমান নয় তাই। একটি ছোট শিশুর কাছে যা সুখ, উঠতি বয়সের কিশোর তাকে সুখ ভাবে না। ছাপোষা চাকুরিজীবী যাকে সুখপাখি মনে করে হন্যে হয়ে খাটছেন, পুঁজিবাদীর ডাইনিং টেবিলে সেই সুখ গলে পঁচে মরে। ষাটোর্দ্ধ অবসরপ্রাপ্ত এক বৃদ্ধা যেখানে সময় পার করে দেন দূরে থাকা সন্তানের অপেক্ষায়, প্রথম প্রেমে পড়া যুবতীর কাছে সুখ কিন্তু একদম ভিন্ন!

চেরোফোবিয়ায় কেন আক্রান্ত হয় মানুষ?

যেমনটা বলেছি, বয়স বাড়ার সাথে সাথে সুখ বিষয়টা অনেক কনফিউজিং হয়ে ওঠে। এর একটা অর্থ দাড়ায় জন্ম থেকেই কেউ চেরোফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আসে না। অতীতের কোনো আঘাত কিংবা কোনো আনন্দের অব্যবহিত পরে আসা দুঃখের অভিজ্ঞতা যে কারো মধ্যেই জন্ম দিতে পারে এই জটিলতার, এই সুখভীতির। চেরোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের অনুভূতিকে দমিয়ে রাখতে চান। মাত্রাতিরিক্ত সুখ থেকে একসময় বেদনা জন্ম নেয়, চেরোফোবিকরা এই বেদনাকে এড়াতে গিয়ে সুখকে মাত্রা ছাড়াতে দিতে চান না। এদের এই অসম্ভব সতর্কতা মেনে চলেন।

সুখ নিয়ে গৌতম বুদ্ধের একটা বাণী রয়েছে,

একবার এক লোক এসে বুদ্ধকে বললো, “আমি সুখ চাই”। বুদ্ধ তার জবাবে বললেন, তুমি প্রথমে ‘আমি’ কে বাদ দাও, এটি হচ্ছে অহমবোধ। এরপর তুমি বাদ দাও ‘চাই’ শব্দটিকে। এ হলো জগতের সকল কামনা-বাসনা। সবশেষে তোমার কাছে যা রইলো, তাই ‘সুখ’।

গৌতম বুদ্ধ বিশ্বাস করতেন, কোন কিছু না চাইলেই ভাল থাকা যায়। সুখের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হল কামনা-বাসনা, এক্সপেক্টেশন।

চেরোফোবিক যারা, কেমন তারা?

চেরোফোবিক ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় অস্বস্তি এবং দায়বদ্ধতাকে। যার কারণে নতুন সম্পর্কের ঝুঁকি নেয় না তারা। একজন মানুষের দায়িত্ব নেওয়া কিংবা প্রিয় মানুষটির প্রত্যাশার মত না হতে পারা এসব চিন্তা তাদের মাথায় জেঁকে বসে থাকে। তারা রিস্ক নিতে চান না। যদি পানিতেই নামতে ভয় হয়, তবে মাছ ধরার আশাও বৃথা।

চেরোফোবিক ব্যক্তিরা প্রায়শই সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো এড়িয়ে চলেন, যা তাদের আনন্দিত করতে পারত। আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তারা জীবনে ‘পরিবর্তন’ বিষয়টাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে থাকেন। এই যেমন বাসা পরিবর্তন করে নতুন ঠিকানায় যাওয়া, হাতের মোবাইলটা পরিবর্তন করা, ল্যাপটপটা আপডেট করা, গাড়িটা পরিবর্তন করা ইত্যাদি।

৩ ধরণের নীতিবাক্য তারা অনুসরণ করেন।

  • “আমি যদি খুশি থাকি তবে পরে আমার সাথে খারাপ কিছু ঘটবে।”
  • “সুখ দেখানো আমার পাশাপাশি অন্যদের পক্ষেও খারাপ” “
  • “সুখী হওয়ার চেষ্টা করা সময় এবং শ্রমের অপচয়।”

তবে হ্যা, চেরোফোবিকরা বড্ড আত্মবিশ্বাসী হন। কারণ তারা আগেই ভেবে নেন ‘সমস্যা হবেই’। কোন কাজ শুরু করার আগে কী কী সমস্যা হবে এসব নিয়ে চিন্তা করাকে নিজেদের দূরদর্শিতা মনে করেন।

চেরোফোবিক যারা, তাদের বলছি,

সুখ একটি ইতিবাচক ধারণা এবং একে গ্রহণ করতে হলে নিজের মধ্যে ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য ধারণ করাও খুব জরুরি। প্রতিটি জিনিসের ভাল ও খারাপ দিক দুটোই থাকবে। কিন্তু সর্বদা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সুখকে দেখলে কখনোই চেরোফোবিয়া থেকে বের হওয়া যাবে না।

সর্বোপরি মানবজন্ম বড় ভাগ্যের জন্ম। এই জন্মে সমস্ত সুখকে-দুঃখকে হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করাতেই আনন্দ। এ থেকে কী ক্ষতি হবে, কী হারিয়ে যাবে তার হিসেব না কশে বরং এই মুহূর্তের আনন্দটুকু গ্রহণ করুন, দিনশেষে খারাপ থাকবেন না!

Total
0
Shares
Leave a Reply

Your email address will not be published.