আমরা

‘বিজ্ঞানপ্রিয়’ বাংলাদেশের একটি অনন্য বিজ্ঞান কনটেন্ট-ভিত্তিক প্লাটফর্ম। ২০১৮ সালে ফেসবুক গ্রুপের হাত ধরে বিজ্ঞানপ্রিয়র যাত্রা শুরু। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চমৎকার সব প্রামাণিক ইনফোগ্রাফিক তথ্য, ভিডিওচিত্র এবং ম্যাগাজিনসহ সময়োপযোগী নানা স্থায়ী-অস্থায়ী উদ্যোগ বিজ্ঞানপ্রিয়কে পৌঁছে দিয়েছে প্রায় ৭ লক্ষাধিক বিজ্ঞানপ্রেমীর মস্তিষ্কে।

যে কারণে পথেঘাটে মমি বিক্রি করা হত

মুহাম্মাদ শাওন মাহমুদ
mummy trading vendors

“মমি নেবেন মমি, খাঁটি মমি, দুটো নিলে একটা ফ্রী” – উনিশ শতকের শুরুর দিকে মিশরের পথে ঘাটে মমি নিয়ে বসে থাকা ফেরিওয়ালাগুলো বাঙালী হলে বোধহয় এভাবেই হাঁকত। কি অবাক হচ্ছেন? মমিও কি অলিতে-গলিতে ঝালমুড়ির মত বিক্রির পণ্য? কী এমন হয়েছিল, যার কারণে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় সমাধিস্থ মমিগুলোকে তুলে এনে দাড় করানো হয়েছিল ফুটপাতে?

এমনকি সে যুগে মিশরে মমির চাহিদা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে রীতিমত ভিক্ষুক ও জেলখানার কয়েদিদের হত্যা করে সে চাহিদা পূরণ করা হয়েছিল। হাজার বছর আগে দাপিয়ে বেরানো রাজা-ফারাওদের মমিগুলোকে ঘিরে যেন সৃষ্টি হয়েছিল এক অশ্লীল বাণিজ্যিক পরিমণ্ডল।

কিন্তু কারা কিনতো এই মমি? কিই-বা করত এগুলো কিনে?

mummy trader 1865 min
উনিশ শতকে একজন মমি ফেরিওয়ালা মমি বিক্রি করছেন | বেচা কেনা কম!

ঘটনার শুরু ১৭৯৮ সালে, যখন পিরামিডের যুদ্ধে মামলুক বাহিনীর বিপক্ষে জয়লাভ করে নাটকীয়ভাবে মিশরের কায়রো দখল করে নেন তৎকালীন ফ্রেঞ্চ আর্মি ক্যাপটেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। তিনি এসে সর্বপ্রথম মিশরের সংস্কৃতিকে ইউরোপীয়দের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। অল্প সময়েই তৎকালীন ইউরোপীয়রা প্রাচীন মিশরের ইতিহাস নিয়ে কৌতূহলী হয়ে ওঠে। মিশরে তখনও প্রচুর সংখ্যক মমি ছিল। কিন্তু ইউরোপীয়দের অপপ্রয়োগে মমিগুলো তাদের বুনিয়াদি শ্রেষ্ঠত্ব হারাতে শুরু করে। অল্প সময়ের ব্যবধানেই মমিগুলো তাদের বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এমনকি তারা এই বিনোদনের বিশেষ একটা নামও দিয়েছিল। ইজেপ্টোম্যানিয়া

সামাজিক অনুষ্ঠানে মমি উন্মোচন

৩০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে মমি উন্মোচন বেশ রোমাঞ্চকর চর্চা ছিল। শুরুর দিকে কেবল গবেষণার উদ্দেশ্যে মমিগুলোর উন্মোচন করার হত। কবি, লেখক, বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক সবাই একযোগে ঝুঁকে পড়ত নিথর মমির উপর। যেহেতু প্রাচীন মিশরের উঁচুশ্রেণীর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মমির সাথে মূল্যবান গয়না, অলঙ্কার ও মণিরত্ন রেখে দেয়া হত, ফলে মমির কাপড়ের ভেতর কে কী অবস্থায় আছে তা স্বচোক্ষে দেখার জন্য রীতিমত উৎসুক থাকতো সবাই। মমি উন্মোচনের এই আয়োজনকে বলা হয় আনর‍্যাপিং পার্টি।

Mummy min
ইউরোপীয়দের মমি আনর‍্যাপিং পার্টি

উনিশ শতকে ইউরোপীয়দের কৌতূহল ‘আনর‍্যাপিং পার্টি’কে এক অন্য লেভেলে নিয়ে যায়। বিয়ে হোক কিংবা কোন সেলিব্রেশন, সামাজিক অনুষ্ঠান হলেই সেখানে মমি উন্মোচন এক অবধারিত আইটেম হয়ে দাঁড়ায়। বিত্তবান ব্যক্তিদের অনুষ্ঠান মানেই আনর‍্যাপিং পার্টি। উচ্ছ্বসিত দর্শক, উল্লাস ও করতালির মধ্য দিয়ে মমি উন্মোচন হয়ে ওঠে ইজেপ্টোমেনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় আয়োজন। সেই সাথে বাড়তে থাকে মমির ডিলারের সংখ্যাও।

যদিও এখনও আনর‍্যাপিং পার্টি আয়োজিত হয়, আরো উন্নত এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে

ওষুধ হিসেবে মমির পাউডার

সময়ের সাথে মমির বহুমুখী ব্যবহার শুরু হয় মিশরে। বাজার থেকে ভ্যাজালমুক্ত মমি কিনে সেগুলোকে চূর্ণ-বিচুর্ণ করে বাদামী রঙের পাউডার বানিয়ে ওষুধ হিসেবে বিক্রি করত তৎকালীন ইউরোপীয়রা [Source]। এক পর্যায়ে ইউরোপীয়রা দাবি করা শুরু করে, তারা আশ্চর্য এক পথ্য আবিষ্কার করেছে, যার মাধ্যমে মৃগীরোগ, রক্তক্ষরণ, কাটা-ছেঁড়া কিংবা বমিজাতীয় সমস্যাসহ বিভিন্ন রোগ সারবে দ্রুত! এরপর থেকেই ওই ওষুধের ব্যবহার বেড়ে যায়। বাদামি রঙের সেই পাউডারকে তারা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে, মলম বানিয়ে কিংবা সরাসরিই খেয়ে ফেলতো [Source]। এটা মমিয়া নামে পরিচিত ছিল। অল্প সময়ে এই পাউডার মিশরের গণ্ডী পেরিয়ে ইউরোপেও সকল রোগের অব্যর্থ ওষুধ হিসেবে সয়লাব হয়ে যায়।

এদিকে যাদের আস্ত দেহ কেনার সামর্থ থাকত না, তারা দেহের খণ্ডাংশ যেমন শুধু হাত, পা কিংবা মাথাটা কিনে নিয়ে যেত। কোন মমি কত সুন্দর ভাবে মমিফাই করা হয়েছিল, তার উপর নির্ভর করত এর দরদাম। এক পর্যায়ে মামিয়া পাউডার এতটাই জনপ্রিয় হয়ে পড়ে, যার কারণে চাহিদা পূরণ করতে এক পর্যায়ে ভিক্ষুক, রোগাক্রান্ত ও জেলখানার কয়েদিদের হত্যা করে মৃতদেহ শুকিয়ে গুড়ো করে মমির চূর্ণের সাথে মিশিয়ে বিক্রি করতে শুরু করেছিল ব্যবসায়ী মহল [Source]

সার ও রঞ্জক হিসেবে মমি পাচার শিল্প বিপ্লবের অগ্রগতির সাথে সাথে মমি ব্যবহারেও পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ১৮২০ থেকে ১৮৪০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মিশর দখলকৃত ইউরোপীয় স্কলার্সরা জৈব সার হিসেবে মমির গুরুত্ব উপলব্ধি করে গণহারে মাটির নিচ থেকে মানুষ ও পশুপাখির মমি তুলে ব্রিটেন এবং জার্মানে পাচার করতে শুরু করে [Source]। প্রচুর মমির অবশিষ্টাংশ এখনও ব্রিটেনে পাওয়া যায়। একটি তথ্যমতে যে পরিমাণ মমি তারা ইউরোপে পাচার করেছিল, তার মধ্যে বিড়ালের মমিই ছিল প্রায় ১৮০,০০০ টি!

E1rEXbiX0AIYKjH
মমির দেহ থেকে তৈরী ‘মামি ব্রাউন’ রং

অন্যদিকে মমি বানাতে যে বিটুমিন ব্যবহৃত হত সেটি দিয়ে একটা বিশেষ রং তৈরী করা যেত, যা মামি ব্রাউন বা এজিপ্টিয়ান ব্রাউন নামে পরিচিত। ইংরেজ চিত্রশিল্পী ও কবিদের কাছে ব্যপক সমাদৃত ছিল এই রং। প্রচুর মমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা হয়েছিল শুধুমাত্র মামি ব্রাউন পিগমেন্ট তৈরী করার জন্য, যা যুক্তরাষ্ট্রের কাগজ শিল্পের জন্য রীতিমত বিজনেস অ্যাসেটে পরিণত হয়ে গিয়েছিল সে সময়। ১৮৩০ এর রোমান্টিসিজম আন্দোলনের আগ পর্যন্ত মমি ব্রাউন ইউরোপীয় ফ্যাশনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।

পুরস্কার হিসেবে মমি এবং মমি সংগ্রহ

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় মমির গুরুত্ব পুনরায় উপলব্ধি করতে শুরু করে মানুষ। এক পর্যায়ে গণহারে মমির ব্যবহার কমে গিয়ে শুধুমাত্র বিশেষ পর্যায়ে সম্মাননা হিসেবে মমি প্রদান এবং মমি সংগ্রহের রীতি চালু হয়। বিশেষ ব্যক্তিশ্রেনীকে সম্মানিত করার উদ্দেশ্যে মমি দেয়া হত উপহার হিসেবে। সেই সাথে ইউরোপীয় এবং আমেরিকান উচ্চাভিলাষী ব্যক্তিদের সংগ্রহের তালিকায় মানুষ এবং পশুপাখির মমির কদর বাড়তে থাকে। চড়া দামে মমি কিনে সংগ্রহ করত তারা। এমনকি মিশরে আসা পর্যটকেরা ফিরে যাওয়ার সময় স্মারক (Souvenir) হিসেবে মমি এবং মমির খন্ডাংশ সঙ্গে করে নিয়ে যেত।

8586472385 ac8a638e32 b
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত দ্য গিবেলিন মমি | এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সর্বাধিক অক্ষত মমি

বলা বাহুল্য মিশর একসময় মমি দ্বারা সমৃদ্ধ ছিল। বর্তমানে মিশরে মমির সংখ্যা সে আমলের তুলনায় খুবই নগণ্য। মিশরীয় ফারাও এবং রাজপরিবারের শোর্য বীর্য, মহত্ব, প্রতিপত্তি ফুটে উঠত একেকটি মমির অবয়বে। উৎসুক জনতার ভীড়ে সে মমিটির কাপড় যখন সরানো হয়, একটু একটু করে বেরিয়ে আসে এমন একটা মুখ, যা হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্ব থেকে লুকিয়ে ছিল। কখনও ভরা সমাবেশে, কখনও বা সম্ভ্রান্ত কোন ব্যক্তির বিলাসবহুল বাড়ীর রোয়াকে। কত শত মমি খন্ড বিখন্ড হয়েছে, কত শত মমি চলে গেছে মানুষের পেটে! হাতে গোনা যে কয়টিই আজ অবশিষ্ট রয়েছে, প্রাচীন মিশরের ঐতিহ্যের পাশাপাশি সেগুলো অদূর অতীতের কিছু নির্মম অপচর্চার গল্পই শোনায়।


তথ্যসূত্র

Total
23
Shares
Leave a Reply

Your email address will not be published.