আমরা

‘বিজ্ঞানপ্রিয়’ বাংলাদেশের একটি অনন্য বিজ্ঞান কনটেন্ট-ভিত্তিক প্লাটফর্ম। ২০১৮ সালে ফেসবুক গ্রুপের হাত ধরে বিজ্ঞানপ্রিয়র যাত্রা শুরু। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চমৎকার সব প্রামাণিক ইনফোগ্রাফিক তথ্য, ভিডিওচিত্র এবং ম্যাগাজিনসহ সময়োপযোগী নানা স্থায়ী-অস্থায়ী উদ্যোগ বিজ্ঞানপ্রিয়কে পৌঁছে দিয়েছে প্রায় ৭ লক্ষাধিক বিজ্ঞানপ্রেমীর মস্তিষ্কে।

ফেলে দেওয়া ঝুট থেকে সাশ্রয়ী সুতো, কমবে দূষণ

মো. তৌহিদুজ্জামান
Jhut theke suta

বাংলাদেশ পোশাক শিল্পে এক অনন্য নাম। বিশ্বের দ্বিতীয় পোশাক রপ্তানিকারী দেশ হিসেবে সুনাম আছে। সেই সুনাম আমাদের টেক্সটাইল শিল্পের জন্যই সম্ভব হয়েছে। সুতো, এর গ্রেডিং-সহ বিভিন্ন গুণগত সকল মান অনন্য করেছে আমাদের এই বৃহৎ শিল্পকে। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অপদ্রব্য বা ফেলে দেওয়া অংশও কম নয়। কাপড়ের কর্তিত অংশ, সুতোর অব্যবহৃত অংশ ইত্যাদি জমে জমে বেশ একটা আকার ধারণ করে। এগুলো পরিবেশের জন্য কেবলই বোঝা কিংবা ভাগাড়ে গিয়ে একসময় মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। ক্ষেত্রভেদে এসব অপদ্রব্য পঁচনের সময়সীমা কয়েক বছর থেকে শতবছর।

Jhut theke suta
ছবি: সফল গবেষণাদল।

আর এই পরিবেশ দূষণটাকেই মাথায় রেখে নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জনাব জি এম ফয়সাল একটি অনন্য উদ্যোগ নেন। তাঁর নেতৃত্বে ওই বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের একটি গবেষণা দল গার্মেন্টস-র ফেলে দেওয়া ঝুট (Jhoot; কোনো পোশাক তৈরির পরে ফিনিশিংয়ের সময় যে অপ্রয়োজনীয় টুকরা-টাকরা কাপড় ফেলে দেওয়া হয়) থেকে ব্যবহারযোগ্য সুতো উৎপাদনের লক্ষ্যে নামেন। গবেষণা শেষে তাঁরা সফলভাবে রোটর সুতা উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেন। শুরুতেই দলটি ঝুট এবং কটনকে বিভিন্ন অনুপাতে মিশিয়ে সুতোর উৎপাদন যাচাই করেন। সে সুতোগুলোর বৈশিষ্ট্য, গুণাগুণ স্থায়িত্ব প্রভৃতি পর্যালোচনায় নামেন। 

বর্জ্যকে মূল্যবান করতেই সুতো নিয়ে এই উদ্যোগ

ছবি: ফেলে দেওয়া ঝুট, গবেষণার রোটর সুতোরপ্রধান উপকরণ।

সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কথা একপাশে রেখে আমরা যদি কেবল পোশাকের কথাই বলি সেটাও উদ্বেগজনক। ষাটের দশকে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। ২০১৬ সালে সেই পোশাক শিল্পের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজারে। ধারণায় করা যায় এসব গার্মেন্টসের সুতা থেকে পোশাক তৈরি, ডায়িং ইত্যাদি ধাপে কী পরিমাণ বর্জ্যের তৈরি হয়। নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উপরিউক্ত গবেষণাদলটি টেকসই উন্নয়নের অংশ হিসেবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন কিছু করার লক্ষ্যেই এই গবেষণায় ধাবিত হয়। গবেষণাদলের সাথে যোগাযোগ করে জানতে চাইলে তাঁরা জানান,

“এসব বর্জ্যের একটি অংশ তুলায় রূপান্তিত করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বালিশ, তোষক ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাকি অংশ পরিবেশে এলোমেলোভাবে ফেলে রাখা হয়, যা থেকে পরিবেশের দূষণ হয়। তাই আমাদের চিন্তা ছিল এ বর্জ্যকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করে পুনরায় সুতোয়  রূপান্তরিত করা।

শুরুটা হয় ফেলে দেওয়া ঝুট থেকেই

গবেষণাদলটি প্রথমে নিট গার্মেন্টস থেকে ফেলে দেওয়া ঝুট সংগ্রহ করে। গার্মেন্টসে সব বর্জ্য একসাথে থাকায় রং অনুযায়ী সর্টেট বা আলাদা করা হয়। আলাদা করে নিয়ে উইলিং মেশিনে দিলে ফাইবারে পরিণত হয়ে যায়। এবার রূপান্তরিত ফাইবার ও ভার্জিন কটন ফাইবার বিভিন্ন অনুপাতে মিশ্রিত করা হয়। সবশেষে রোটর (রোটর হচ্ছে সুতা স্পিনিং করার একটি জনপ্রিয় কৌশল। এর মাধ্যমে ফাইবার পাক দিয়ে সুতা তৈরি করা হয়) ইয়ার্ন ম্যানুফ্যাকচারিং প্রক্রিয়ার দ্বারা সম্পূর্ণ সুতোর চেহারা পায়। দলটি একটি স্পিনিং ইন্ডাস্ট্রির সহযোগিতায় পুরো গবেষণা কাজটি করতে সফল হয়। তাঁরা মনে করেন, দেশে স্বয়ংসম্পূর্ণ ইন্ডাস্ট্রি-র সহযোগিতা ছাড়া বস্ত্রশিল্পে কোনো ধরনের গবেষণা করা সম্ভব হবে না। ফলে এই গবেষণায়/উদ্যোগে বেশি একটা বেগ পোহাতে হয়নি।

আরও পড়ুন,
জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের আদ্যোপান্ত।

প্রাথমিক অবস্থায় ঝুট থেকে ফল পাওয়া এই সুতোর উৎস নিট গার্মেন্টস হলেও গবেষণা দলের আশা, পরবর্তীতে ওভেন গার্মেন্টস ঝুট  থেকে তৈরি করে দেখা যেতে পারে।

রোটরের এই সুতোগুলোর স্থায়ীত্ব ও খরচ কেমন হবে?

cYK2JDgTCn04b ALQEobmfs jJE5J4ozFmR U7XCUtEYGbukHedhuNzawIlMxEOGUAVjT DvPdjIzxrCSq Xp0vMm3Ms8kb21427Zgk 7CrjcjJUYfF84b8vXrWRuN52TBhm kmhevl3vnhS0nYo5No
ছবি: উৎপাদিত সুতো।

নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দলটি দাবি করে, তাঁদের উৎপাদিত সুতার বৈশিষ্ট্য র-কটন (raw-cotton) ফাইবার থেকে উৎপাদিত সুতার বৈশিষ্ট্য-এর কাছাকাছি। সুতরাং এধরনের (সাসটেইনেবল) টেকসই সুতা বর্তমান বিশ্বে খুবই দরকার এবং পরিবেশবান্ধব। এর ফলে পোশাকশিল্পের অপচয় তো কমবেই বাড়বে উৎপাদন। 

এদিকে বর্জ্য ঝুট থেকে উৎপাদিত এই সুতোর খরচ আশা করা যাচ্ছে র-কটন থেকে অনেক কম হবে। কারণ এই গবেষণায় র-ম্যাটারিয়ালস বা প্রধান উপাদান ছিল ঝুট। যেগুলোর আদতে কোনো খরচ নেই। এখন প্রয়োজন কেবল স্বীকৃতির।

gb9ZkH7cuU4L6c2oNQGdS F0LvFTuJKTILmqCCQKJaOrJoj6kCN4K6RKt1fzQkXRYDypSY ast1f8kePaR04vFIQDg1nE
ছবি: পিয়ার রিভিউড-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্র।

এই প্রক্রিয়ার উপর লিখিত গবেষপ্রবন্ধটি একটি আন্তর্জাতিক মানের পিয়ার রিভিউড গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। বর্জ্য থেকে প্রাপ্ত রোটর সুতায় সফল এই গবেষণাদলটি তাদের এ উৎপাদিত সুতাকে টেকসই উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখছেন। অদূর আগামীতে তাঁদের এই কাজটি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের এক বিপ্লব আনতে পারে। গবেষণা দলের প্রধান জনাব জিএম ফয়সাল বলেন,

“এই সুতোর উৎপাদন যদি বৃহৎ পরিসরে করা সম্ভব হয় তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই এটি খরচ কমাবে। গার্মেন্টসের ঝুট কাপড় অনেক সময় পরিবেশের ক্ষতি করে এজন্য যদি পূনর্ব্যবহার উপযোগী করা যায় তাহলে পরিবেশের জন্যও ভালো হবে। তবে এটির বৃহৎ পরিসরে ব্যবহারে প্রয়োজন সচেতনতা ও গার্মেন্টস কর্ণধারদের সদিচ্ছা এবং সরকারের সুদৃষ্টি।”

আমাদের আশা, যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই অনন্য উদ্ভাবনে বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্প অনেক উপকৃত হবে। গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত হলে আমাদের গবেষকরা অনেক ভালো কাজ করতে পারেন, সেটাও বিশ্ব জানবে। ঝুট সুতো উৎপাদনে এই গবেষকদল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট সহায়তা পেয়েছেন বলেই মাঠপর্যায়ে খুব একটা কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি।

তথ্যসংগ্রহ ও লেখা: মো. তৌহিদুজ্জামান,
প্রধান-সম্পাদক, বিজ্ঞানপ্রিয়।

Total
0
Shares
Leave a Reply

Your email address will not be published.