আমরা

‘বিজ্ঞানপ্রিয়’ বাংলাদেশের একটি অনন্য বিজ্ঞান কনটেন্ট-ভিত্তিক প্লাটফর্ম। ২০১৮ সালে ফেসবুক গ্রুপের হাত ধরে বিজ্ঞানপ্রিয়র যাত্রা শুরু। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চমৎকার সব প্রামাণিক ইনফোগ্রাফিক তথ্য, ভিডিওচিত্র এবং ম্যাগাজিনসহ সময়োপযোগী নানা স্থায়ী-অস্থায়ী উদ্যোগ বিজ্ঞানপ্রিয়কে পৌঁছে দিয়েছে প্রায় ৭ লক্ষাধিক বিজ্ঞানপ্রেমীর মস্তিষ্কে।

শীতকালে বৃষ্টি এবং পশ্চিমা বায়ুর উপদ্রপ!

মুহাম্মাদ শাওন মাহমুদ
শীতকালে বৃষ্টি

৪ঠা ফেব্রুয়ারি ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ। ঢাকায় বসে যখন লেখাটা যখন লিখছিলাম, তখন শীতের মধ্যেও বাইরে একেবারে ঝড়ের তাণ্ডব চলছিল। এমনিতেই এক মাঘে শীত যায় না, তার উপর ঝড়-বৃষ্টির প্রকোপ। কিন্তু বাংলাদেশে তো শীতের মধ্যে সচরাচর বৃষ্টি হয় না। তাহলে গত কয়েক বছর ধরে কেন মেঘ না চাইতেই জল এসে জুড়ে বসছে? কারণটা কি যথারীতি বায়ুদূষণ টাইপের কিছু? নাকি পশ্চিমা কোন অদৃশ্য শক্তি আমাদের পাকা ধানে মই দিচ্ছে?

ব্যপারটা বেশ মজার। কিন্তু আবহাওয়া ব্যপারটা একেবারে ভিন্ন একটা পাঠ হওয়ায় এই সংক্রান্ত তথ্যগুলো ব্যাখ্যা করতে বেশ জটিল দাঁতভাঙা কিছু টার্ম সামনে চলে আসে। কিন্তু এই স্টোরিতে যতটুকু সম্ভব সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করব।

Winter Rain in Bangladesh image
বেশ কিছু বছর ধরে শীতের ঋতুতে বাংলাদেশে নিয়মিত বৃষ্টিপাত দেখা যাচ্ছে

সমুদ্রের অস্থির ঢেউয়ে সাঁতার কাটতে কেমন লাগে তা জানতে হলে আপনাকে আগে নদী বা পুকুরের শান্ত পানিতে সাঁতার কাটার অভিজ্ঞতা নিতে হবে। ঠিক তেমনি, ‘শীতকালে বৃষ্টি কেন হয়’ এটা জানতে হলে প্রথমে আমাদের জানতে হবে শীতকালে কেন বৃষ্টি হয় না বা হত না, তথা ‘স্বাভাবিক ঘটনাটা’ আসলে কী?

কেন বাংলাদেশে শীতকালে সচরাচর বৃষ্টি হয় না?

আমাদের পৃথিবী একটা উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। বাংলাদেশ তথা উত্তর গোলার্ধে যখন শীত নামে অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত পৃথিবী সূর্যের তুলনামূলক কাছে অবস্থান করে। এ সময়টা পৃথিবীর ঘূর্ণন (স্পিনিং) গতি কিছুটা বেড়ে যায়। কেননা জোহানেস কেপলার সাহেব তো বলেই গেছেন,

গ্রহ তাহার নক্ষত্রের যত কাছে থাকিবে, প্রাণের উল্লাসে ঘুরিবে তত জোরে।

আর দ্রুত ঘুরে বলেই দিনের দৈর্ঘ্য হয় ছোট। জানি এখানে বড়সড় একটা প্রশ্ন আছে, “পৃথিবী সূর্যের কাছে অবস্থান করলে আবার শীত আসে কেমনে! তখন তো কাঠফাটা গরম পড়ার কথা ছিল। প্রশ্নের উত্তর অন্য কোন লেখায় দেব। আপাতত জটিলতায় না গিয়ে ট্র্যাকে ফিরে আসি

ধরে নিই বিষুবরেখা, ক্রর্কটক্রান্তি বৃত্ত, মকরক্রান্তি বৃত্ত এই তিনটা রেখা সম্পর্কে পাঠকের কিছুটা হলেও ধারণা আছে। বাংলাদেশ পুরোপুরি কর্কটক্রান্তি রেখার উপরে পড়েছে। যেহেতু পৃথিবী সূর্যের দিকে নিজ অক্ষের সাপেক্ষে ২৩.৪ ডিগ্রি হেলে থাকে, ফলে আমাদের উত্তর গোলার্ধে যখন শীত, তখন সূর্যের আলো কর্কটক্রান্তি সংলগ্ন অঞ্চলে খাড়াভাবে পড়ে না, অনেকটা বেঁকে পড়ে [Source]। আর এটাই এ সময় নিম্ন তাপমাত্রার কারণ।

Winter
ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত কর্কটক্রান্তি রেখার উপর খাড়াভাবে সূর্যের আলো পড়ে না।

অন্যদিকে মকরক্রান্তি সংলগ্ন অঞ্চলে (e.g. অস্ট্রেলিয়া) এ সময় সূর্যের আলো মোটামুটি খাড়াভাবে পড়ে। যার ফলে সেসব অঞ্চলের তাপমাত্রা থাকে বেশি। আর তাপমাত্রা বেশি থাকায় সেখানকার বায়ু হালকা হয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে এবং যথারীতি শূন্যস্থানের সৃষ্টি হয়। আর সে শূন্যস্থান পূরণ করতে কর্কটক্রান্তি অঞ্চল থেকে বায়ুপ্রবাহ মকরক্রান্তির দিকে ধাবিত হয়, যার একটা অংশ যায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে। এই বায়ুপ্রবাহকে বলা হয় মৌসুমি বায়ু। সুতরাং মাথায় রাখতে হবে ডিসেম্বর-মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের উপর দিয়ে যে মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয় তার দিক থাকে উত্তর থেকে দক্ষিণের দিকে। i.e. যদিও গ্রীস্মের দিকে আবার এর উল্টো ঘটনা ঘটে। তবে এ বায়ু কিন্তু দেহ-মন-প্রাণ জুড়ানো ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন দখিণা হাওয়া নয়, বরং এই বায়ুর রাজত্ব ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০-১১ কিলোমিটার উচ্চতায়। আর এই বায়ুই ঋতু নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলে।

সাইবেরিয়ান হাওয়া অনার্দ্র হওয়ায় বাংলাদেশে শীতকালে সাধারণত বৃষ্টি হয় না।

বিদেশ থেকে জামাই এল, গর্ব না আর ধরে
পথে যত গোবর ছিল, সব নিয়ে-লো ঘরে!

উত্তর গোলার্ধ থেকে যে বায়ুপ্রবাহ মকরক্রান্তির দিকে ধাবিত হয়, তাকে প্রকাণ্ড সাইবেরিয়া প্রদেশ এবং হিমালয় অতিক্রম করে আসতে হয়। আসার পথে যথারীতি এ বায়ু সাইবেরিয়া এবং হিমালয়ের আর্দ্রতা নিয়ে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। এদিকে তাপমাত্রা কম থাকায় সাইবেরিয়া, হিমালয়ের আর্দ্রতা থাকে খুব কম। আর আর্দ্রতা কম থাকায় এ সময় বাংলাদেশে বৃষ্টি হতে দেখা যায় না।

এখন কেন শীতে বৃষ্টি হচ্ছে!

পাকা ধানে মই পড়ে তখনই যখন তীব্র বায়ু দূষণ এবং তাপমাত্রার অসমতার কারণে ট্রপিকাল ডিসটার্ব্যান্স-এর প্রভাব সোজা এসে পড়ে মৌসুমি বায়ুপ্রবাহে। বাতাসে প্রচুর ধুলোবালির কণা উপস্থিত থাকলে তাতে প্রচুর জলীয় বাষ্পের কণা জমতে থাকে যা দ্রুত মেঘ জমাতে সাহায্য করে। ফলে শীতের মৌসুমে বাতাসের আর্দ্রতা যতটুকু থাকার কথা, তার থেকে অনেক বেশি থাকে। এমন অবস্থায় উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের (কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি বৃত্তের মধ্যবর্তী অঞ্চল) সমুদ্রগুলোতে যদি ছোটখাটোও কোন ট্রপিকাল ডিসটারব্যান্স বা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয় তার একটা বড়সড় প্রভাব এসে পড়ে লোকাল এরিয়াগুলোতে। কারণ লোকাল এরিয়াতে দূষণ বেশি।

Winter 2 Ultra
এশিয়ার এই অঞ্চলে শীতকালে কোন কারণে নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে চারদিক থেকে আর্দ্র বায়ু এসে ঘুর্ণিঝড় সৃষ্টি করে

এদিকে বায়ুতে অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড উপস্থিত থাকায় তা অধিক তাপমাত্রা ধরে রাখে। (যেমন দেখুন, এবারের শীতে মাঝেমধ্যে তীব্র ঠান্ডা থাকলেও হুট করে গরম পড়ে যাচ্ছে) ফলে শীতের মধ্যেও কিছু কিছু সময় বঙ্গপোসাগরীয় অঞ্চলের তাপমাত্রার সাথে লোকালয়ের তাপমাত্রায় ব্যপক পার্থক্য বা অসমতা সৃষ্টি হচ্ছে। তাপমাত্রার অসমতা মানে নিম্নচাপ সৃষ্টি। আর নিম্নচাপ যে দিকে, বায়ুপ্রবাহ সেদিকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বঙ্গপোসাগর থেকে বায়ু লোকালয়ের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে (মৌসুমি বায়ুর উল্টো)। এদিকে সমুদ্রাঞ্চলের বায়ুর আর্দ্রতা কিন্তু বেশি। ফলস্বরূপ অসময়ে বৃষ্টি!

অসময়ে বৃষ্টিতে আমি
অসময়ে বৃষ্টিতে তুমি…

ঘটনা এতটুকু হলেও পারত। পাকা ধানে শুধু মই-ই না, ট্রাক্টরও পড়ে যখন মাথার উপর এসে জুড়ে বসে আরো এক ধরণের আর্দ্র বায়ুপ্রবাহ। আর সেটি হচ্ছে “ওয়েস্টার্ন ডিসটারব্যান্সেস” বা পশ্চিমী জ্বালাযন্ত্রণা (কিডিং)। আমাদের পশ্চিমে ভারত, পাকিস্তান, ইরান, ইরাক, জর্ডান পেরলে পাওয়া যায় মেডিটেরানিয়ান সাগর। বাংলায় যাকে আমরা ডাকি ভূমধ্যসাগর বলে। প্রতি বছর এই সময়টাতে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে একটা বায়ুপ্রবাহ আমাদের এই অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়। ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি থেকে তামিলনাড়ূ পর্যন্ত এ বায়ুপ্রবাহের প্রভাব বজায় থাকে। যেহেতু সমুদ্রাঞ্চলের বায়ু, আর্দ্রতা তুলনামূলক বেশী। ফলস্বরূপ ভারতের এই অঞ্চলগুলোতে প্রতি বছরই শীতে বৃষ্টিপাত হতে দেখা যায়। এই বায়ুপ্রবাহকে বলা হয় ওয়েস্টার্ন ডিস্টার্ব্যান্সেস।

মজার ব্যপার হল, বাংলাদেশ এই বায়ুপ্রবাহের গতিপথ অভিমুখে পড়লেও এটি বাংলাদেশ পর্যন্ত পৌঁছাত না। তবুও যেহেতু ইতোমধ্যে পৃথিবীর গ্লোবাল ওয়েদার প্যাটার্নে পরিবর্তন চলে এসেছে, তাই এ বিষয়টাকে আমরা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানও করতে পারি না। সুতরাং বাংলাদেশের অসময়ের বৃষ্টির পেছনে ওয়েস্টার্ন ডিসটারব্যান্স দায়ি থাকলেও থাকতে পারে। যদিও এই বায়ুপ্রবাহ কৃষিখাতের জন্য আশীর্বাদ।


Additional Sources:
Why are hurricanes forming in January?
Falling Trend of Western Disturbances in Future Climate Simulations

Total
0
Shares
Leave a Reply

Your email address will not be published.